উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) কমাতে কি করণীয়?

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaস্বাস্থ্যউচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) কমাতে কি করণীয়?
Advertisements

হাইপারটেনশন (Hypertension), যার আরেক নাম উচ্চ রক্তচাপ, HTN, বা HPN, হল একটি রোগ যখন কোন ব্যাক্তির রক্তের চাপ সব সময়েই স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বে। হাইপারটেনশনকে প্রাথমিক (আবশ্যিক) হাইপারটেনশন অথবা গৌণ হাইপারটেনশনে শ্রেণীভুক্ত করা হয়। প্রায় ৯০–৯৫% ভাগ ক্ষেত্রেই “প্রাথমিক হাইপারটেনশন” বলে চিহ্নিত করা হয়। বাকি ৫-১০% বিভিন্ন রোগের কারণে হয়।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ কী?

সবার শরীরেই রক্তে নির্দিষ্ট একটি চাপ থাকে। সিস্টোলিক যেটা সেটা যদি ১৪০ বা তার বেশি হয়, আর ডায়াস্টোলিক বা তার নিচেরটা যদি ৯০ বা তার বেশি হয়, তাহলেও তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়।

রোগীকে বাইরে থেকে দেখে অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ বোঝা যায় না, চিকিৎসক প্রেসার মেপে দেখে উচ্চ রক্ত চাপ সনাক্ত করে থাকেন। আবার অনেক সময় লক্ষণ দেখা যায়, যেমন, মাথাব্যাথা, ঘাড়ে ব্যাথা বা বমি ভাব হওয়া, ইত্যাদি।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে জটিলতা হতে পারে

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে জটিলতা আরও বেড়ে যেতে পারে। যেমন ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, চোখে সমস্যা, কিডনির সমস্যা। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে মূলত: এই চারটি অঙ্গেরই ক্ষতি হতে পারে।

শিশুদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে

শিশুদের মধ্যে কিডনি ও হরমোনজনিত কারণে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপে চিকিৎসকগণ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দেন

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেশারকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। গ্রীষ্মকালে অনেকেই উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে অভিযোগ করেন ও চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হনে। যে সকল কারণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে সেগুলো হল: বেশী লবণ গ্রহণ, অতিরিক্ত মেদ, কাজের চাপ, মদ্যপান, পরিবারের আকার, অতিরিক্ত আওয়াজ এবং ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকা। চিকিৎসকগণ এ অবস্থায় প্রথমে খাদ্যাভাসে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন; পরবর্তীতে ঔষুধ প্রেসক্রাইব করেন।

এমনই কয়েকটি খাদ্যের কথা নিয়ে আলোচনা করা হল।

আরও পড়ুন:  কখন মধু (honey) খেলে উপকার বেশি পাবেন

বেরি বা জাম জাতীয় ফল

এতে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে যা উচ্চ রক্তচাপ কমায়। ‘জার্নাল অফ দ্য অ্যাকাডেমি অফ নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস’-এ প্রকাশিত হয়েছে, বেরি আ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবেও কাজ করে।

দুধ

ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-তে ভরপুর! ফলে, ব্লাড প্রেশার কমায়। লন্ডনের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত এক গ্লাস দুধ খেলে হাই ব্লাডপ্রেশার এক তৃতীয়াংশ কমে যায়।

টকদই বা ইয়োগার্ট

কিছু সংখ্যক মহিলাদের উপর একটি পরীক্ষা করে ‘অ্যামেরিকান হার্ট অ্যাসোশিয়েশন’। সেই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, সেইসমস্ত মহিলা, যাঁরা টানা সাতদিন, দিনে একবার করে টকদই খেয়েছেন, তাঁদের প্রেশার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তুলনায় যাঁরা টকদই খাননি, তাঁদের ব্লাড প্রেশার অনেকটাই বেশি!

তরমুজ

‘অ্যামেরিকান জার্নাল অফ হাইপারটেনশন’-এর স্টাডি অনুযায়ী, যাঁদের ওজন বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্লাড প্রেশার কমাতে এক্সপার্ট তরমুজ।

কলা

এতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে যা হাই ব্লাড প্রেশার কমায়।

রসুন

রসুন আমাদের শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করে। অনেক ধরনের খাদ্য তৈরিতে রসুন একটি বিশেষ উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। প্রতিদিন এক টুকরো কাঁচা রসুন খাওয়ার অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপকে শরীর থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে।

[adinserter block=”1″]

রক্তনালীর ব্লক থেকে রক্ষা পাবেন যে ভাবে
রক্তনালীর ব্লক থেকে রক্ষা পেতে করণীয়রক্তনালীর ব্লক থেকে রক্ষা পেতে করণীয়

উচ্চ রক্তচাপ: খাদ্য যা এড়িয়ে চলবেন

কিছু খাবার আছে যা উচ্চ রক্তচাপ ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলা উচিত। এখানে একটি তালিকা দেওয়া হল:

লবণ

লবণ উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ আক্রান্ত মানুষের জন্য খুবই খারাপ। আমেরিকানদের খাদ্যতালিকাগত নির্দেশিকা অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ বা প্রিহাইপারটেনশন ব্যক্তিদের সোডিয়াম ভোজন সীমিত করা উচিত। আপনার খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ যোগ এড়িয়ে চলুন।

আচার

লবণ ক্যানিং এবং লম্বা সময়ের জন্য সংরক্ষণের জন্য আচারে সংযোজন করা হয়|আপনি যদি উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন, তাহলে খাদ্য তালিকা থেকে আচার বাদ দিয়ে দিন।

আরও পড়ুন:  করোনায় শিশুদের যেসব উপসর্গ দেখা দেয়

ডেলি মাংস

প্রক্রিয়াজাত মাংসে সোডিয়ামের মাত্রা বেশি থাকে আর তাই আপনার রক্ত চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে|আপনার খাদ্যে এই ধরণের প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।

টিনজাত খাবার

টিনজাত খাবার লবণ দিয়ে সংরক্ষিত করা হয় এবং এতে সোডিয়ামের মাত্রা বেশি থাকে। টিনজাত খাবার, সূপ, ঝোল এবং স্টক খুব খারাপ হতে পারে| জৈব খাদ্য যাতে কম সোডিয়াম আছে এমন খাবার বেছে নিন।

চিনি

অত্যধিক চিনি খাওয়া শুধু ডায়াবেটিস ও স্থূলতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে তাই নয়, এটি আপনার রক্ত চাপ ও বাড়িয়ে দেয়| তাছাড়া, উচ্চ রক্তচাপ মাত্রাতিরিক্ত ওজনের এবং মোটা মানুষের মধ্যে বেশি প্রচলিত| সুতরাং, চিনি-যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।

মুরগীর মাংস

মাংস নয় তবে মুরগির চামড়ায় চর্বির মাত্রা বেশি থাকে যা রক্তচাপ প্রভাবিত করে| লাল মাংস এবং মাখন চর্বিতে পরিপূর্ণ যা রক্ত চাপ রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

কফি

কফি বা ক্যাফেইনে যদি আসক্ত হন, তাহলে এই পানীয়কে বিদায় বলার সময় হয়েছে|কফি অস্থায়ী ভাবে রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলে।

অ্যালকোহল

গবেষকদের মতে, এক সঙ্গে তিন গ্লাস অ্যালকোহল পানে অস্থায়ীভাবে উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা বাড়াতে পারে| তাছাড়া, এলকোহল উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধগুলি প্রভাবিত করে।

লাইফস্টাইলে পরিবর্তন আনুন

এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপের ভূক্তভোগীদেরকে লাইফস্টাইলে ইতিবাচক পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলো অনেক গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হয়। যেমন :

  • অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করে গ্রহণযোগ্য ওজন বজায় রাখা।
  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা।
  • রাতে সঠিকভাবে ঘুমানো।
  • অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা এড়িয়ে চলা।
  • ধূমপান থেকে বিরত থাকা।

জরুরি অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা

  • রক্তচাপ ও রক্তে চিনির পরিমাণ মাপার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • রক্তচাপ ১৮০/১১০ এর বেশি হলে রোগীকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।
  • পরীক্ষা করে রক্তে চিনির পরিমাণ ৫ মিলি মোলের কম হলে রোগীকে মিষ্টি খাবার খাওয়াতে হবে।
  • রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে কোন প্রকার পানীয় খাওয়ানো যাবে না। রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
আরও পড়ুন:  ট্যালকম পাউডার ব্যবহারে হতে পারে ক্যানসার

একটু ভাল লাগলে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না

উচ্চ রক্তচাপের অনেক রোগী রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও থাকে।

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় রোগী বয়স, উচ্চ রক্তচাপের তীব্রতা, আনুষঙ্গিক অন্য রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস, হাঁপানি, প্রোস্টেটের সমস্যা, গর্ভাবস্থা, ইত্যাদি) অনেক বিষয় বিবেচনা করেই রক্তচাপ কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়। রোগীর অবস্থা বুঝে ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয়। এক জনের জন্য যে ওষুধ উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে, অন্য রোগীর ক্ষেত্রে সেটা প্রাণঘাতি হতে পারে। তাই, এ রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়ার কথা চিন্তাও করবেন না।

সারকথা

উচ্চ রক্তচাপ হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই সুস্থ জীবনের একমাত্র নিশ্চয়তা দিতে পারে। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে হবে। এর জন্য আমাদের সচেতনার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে ওষুধ সেবন ও কর্মচঞ্চল জীবনযাপনের সুস্থ্য অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ক্যাটাগরিঃ স্বাস্থ্য