গাজরের উপকারিতা – কেন গাজরকে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যকর খাবার বলা হয়?

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaস্বাস্থ্যগাজরের উপকারিতা – কেন গাজরকে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যকর খাবার বলা হয়?
Advertisements

গাজরে অভাবনীয় উপকারিতা রয়েছে। এটা একটি শীতকালীন মূল (root) জাতীয় সব্জি। এর রয়েছে শক্তিশালী স্বাস্থ্যকর উপকারিতা যা আমরা অনেকেই হয়ত জানি না।

সসে ডুবিয়ে খাওয়া জনপ্রিয় স্ন্যাকসজাতীয় খাবার, অথবা জুস তৈরীতে, কিংবা স্ট্যু বা স্যুপ তৈরীতে গাজরের বহুল ব্যবহার রয়েছে। প্রাচীন কাল থেকেই এই সব্জির ব্যবহার হয়ে আসছে।

আবার, অনেক আগে থেকেই রোগ নিরামিয়কারী সব্জি হিসাবে গাজরের উপকারিতা আমাদের পূর্বপুরুষেরা জানতেন। বিভিন্ন রোগে ও রোগ পরবর্তী দূর্বলতায় পথ্য হিসাবে গাজর খাবার চল আছে।

সঠিকভাবে রান্নায় গাজরের উপকারিতা বৃদ্ধি পায়

কাঁচা গাজর খাওয়ার উপকারিতা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, গাজরকে রান্না করে খেলে গাজরের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি পায়। আরেকটি গবেষণা থেকে রান্না করা গাজরের আরও উৎসাহব্যঞ্জক উপকারিতার কথা জানা গেছে।

কাঁচা গাজরের তুলনায় রান্না করা গাজরে উচ্চ মাত্রায় ফেনোলিক এসিড এবং বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে এবং রান্না করা গাজর খেলে শরীরের অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কার্যকারিতা ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর থাকে।

গাজরের স্যুপের সাথে গাজরের পিল (চোচা) যোগ করলে এতে অ্যান্টি-অক্সেডেন্টের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এ কারণেই পুষ্টিবিদগণ সাধারণতঃ শাক-সবজিকে কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ করে খাওয়াকে বেশী পছন্দ করেন; কারণ, এতে পুষ্টির মাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি থাকে। গাজরের ক্ষেত্রে অল্প সিদ্ধ বা স্টিম করে খাওয়াটাই ভাল।

গাজরে স্বাস্থ্যের জন্য কি কি উপকারিতা রয়েছে?

নিয়মিত গাজরের জুস বা কাঁচা গাজর খাওয়ার মধ্যে দিয়ে আপনার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগান দেয়ার পাশাপাশি গাজর শরীরের জন্য অন্যান্য স্বাস্থ্যকর উপকারিতা বয়ে নিয়ে আসে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার এমন অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যেগুলো থেকে এ কথা অনস্বীকার্য যে, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ ভেজিটেবল ও ফল-ফলাদি হৃদরোগ ও ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধ করতে শরীরকে দারুণভাবে সহায়তা করে। আর, গাজর একটি পারফেক্ট অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ খাবার। দামেও কত সস্তা!

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, নীচের প্যারাগুলো গাজরের কিছু উপকারিতার কথা আলোচনা করা হল, যে কারণে আপনি আপনার প্রাত্যহিক জীবনে গাজরকে রাখতে চাইবেন।

১। ক্যান্সার প্রতিরোধ

বিভিন্ন খাবারের সাথে থাকা ক্যারোটিনয়েডের প্রমাণিত ক্যান্সার প্রতিরোধক গুণাবলী (proven anti-cancer effects) রয়েছে; এ সব খাবারে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের ফ্রি রেডিকেলসমূহকে হ্রাস করে।

লাংগ ক্যান্সার (Lung caner): সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে যারা ধূমপান করেন এবং সপ্তাহে একাধিকবার গাজর খান, তাদের তুলনায় যারা গাজর খান না তাদের ক্যান্সার হওয়ার ৩ গুণ বেশী সম্ভাবনা থাকে।

কোলন ক্যান্সার (Colon cancer): জাপানের গাজর ভক্ষণকারীদের শরীরে বিটা-ক্যারোটিনের প্রভাবের কারণে তাদের শরীরে কোলন ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা কম থাকে।

প্রোস্টেট ক্যান্সার (Prostate cancer): তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যাদের খাদ্য তালিকায় বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি থাকে, তাদের শরীরে প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে পজিটিভলি সাড়া দেয়। Harvard School of Public Health’s Department of Nutrition এর একদল গবেষক তাদের গবেষণা থেকে এমনই তথ্য খুঁজে পেয়েছেন।

লিউকেমিয়া (Leukemia): ২০১১ সালে একদল গবেষক দেখেছেন যে, গাজরের জুস থেকে পাওয়া এক্সট্রাক্ট (extract) লিউকেমিয়া সেলকে ধবংস করে এবং তাদের তৈরী হওয়াকে বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

২। দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারে গাজরের ভূমিকা

ডিউকের (Duke) চোখ-বিশেষজ্ঞ জিল কুরী (Jill Koury) বলেন, ভিটামিন “এ” এর অভাবে চোখের আলো সংবেদনশীল কোষগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় এবং ভিটামিনের অভাবে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। ভিটামিন “এ” এর অভাব দূরীকরণে এমন খাদ্য গ্রহন করতে হবে যাতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে এবং যা দৃষ্টিশক্তির এই ক্ষতিকর প্রভাবকে পূরণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞগণ এটাও বলছেন যে, বেশীর ভাগ মানুষ যারা ইতিমধ্যেই ভিটামিন “এ” এর অভাবজনিত রোগে ভূগছেন না, তারা গাজর খেয়ে রাতারাতি উপকার পাবেন না।

৩। কোলেস্টোরেলের মাত্রা কমান

গাজরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ দ্রবনীয় ফাইবার। এই ফাইবার আসে গাজরে থাকা পেকটিন নামক উপাদান থেকে। দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এই পেকটিনের প্রমাণিত ভূমিকা রয়েছে।

যিনি এক নাগাড়ে ৩ সপ্তাহ ধরে এক কাপ করে গাজর খাবেন, তার শরীরের কোলেস্টোরলের ক্ষতিকর মাত্রা কমে যায়। আর এই চমৎকার তথ্যটি উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী সংস্থার গবেষণা থেকে।

৪। হাড় সুস্থ রাখতে গাজর খান

গাজর একটি সুপারফুড। এতে শরীর গঠনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন “সি” এবং ক্যালসিয়ামও রয়েছে। ১ কাপ গাজরে রয়েছে ৯৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং ৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন “সি”।

মনোপজ পরবর্তী অনেক মহিলার শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাবজনিত জটিলতা দেখা দেয়। গাজরে এত পরিমাণ ক্যালসিয়াম নেই, তবে গাজর খাওয়ার মাধ্যমে তাদের এই অভাবের কিয়দংশ হলেও পূরণ করা সম্ভব।

৫। স্মৃতি শক্তি হারানো প্রতিরোধে গাজর

নেদারল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা মূলজাতীয় সবজি খেয়ে থাকেন, তাদের তুলনায় যারা এমন কিছু খান না, তারা প্রথমোক্তদের তুলনায় ৩ গুণ বেশী স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেন। বিজ্ঞানীগণ তাদের গবেষণার সারাংশে লিখেছেন, সব্জির বিটা-ক্যারোটিন, বিশেষ করে গাজরে থাকা বিটা-ক্যারোটিন, শরীরের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।

হার্ভার্ডের (Harvard) আঠারো বছরের গবেষণায় জানা যায়, দুই দিনের জন্য ৫০ মিলিগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ব্যক্তি এবং বিটা-ক্যারোটিনের সমকক্ষ ঔষধ গ্রহণকারীদের তুলনায় ১ থেকে দেড় বছরের সমতুল্য ক্ষয়কে বিলম্বিত করে থাকে।

৬। ডায়াবেটিস (Diabetes) প্রতিরোধে গাজর

গাজরে বিদ্যমান বিটা-ক্যারোটিন খুবই উপকারী এই কারণে যে, এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কারণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। যাদের রক্তে বিটা-ক্যারোটিনের মাত্রা বেশী থাকে, বিটা-ক্যারোটিনের কম মাত্রাযুক্ত ব্যক্তিদের তুলনায় প্রথমোক্তদের রক্তে ৩২% ইনসুলিনের পরিমান বেশী থাকে, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য জানা গেছে।

গাজরের পুষ্টি তথ্য

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ কাপ টুকরা করে কাটা গাজরকে এক সার্ভিং ধরে এ থেকে আমরা পাই:

  • ২৫ ক্যালোরী
  • ৬ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট
  • ৩ গ্রাম চিনি
  • ১ গ্রাম প্রোটিন

উপরোন্তু, এ থেকে ২১০% ভিটামিন “এ” জোগান দিয়ে গাজর হল ভিটামিন “এ” এর আদর্শ উৎস। এছাড়াও, প্রতি সার্ভিং থেকে আমাদের দেহের দৈনিক চাহিদার ২% ক্যালসিয়াম, ২% লৌহ এবং ৬% ভিটামিন সি পেয়ে থাকি।

মজার একটি তথ্য হল, গাজরে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিটা-ক্যারোটিনের উপস্থিতির ফলে গাজর উজ্জ্বল গাঢ় কমলা বর্ণ ধারণ করে।

এই বিটা-ক্যারোটিন যখন আমাদের পাকস্থলীতে পৌছায় তখন বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় তা থেকে আমরা ভিটামিন এ পেয়ে থাকি।

গাজরের থাকা অন্যন্য পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন “কে”, ফাইবার, ফোলেট, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক, ম্যাংগানিজ, ফসফরাস এবং ভিটামিন “ই”।

গাজর খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি

আপনার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকাকে আরও সুষম করতে এবং গাজরে থাকা পুষ্টির সর্বোচ্চ পরিমাণটি পেতে চাইলে গাজর সঠিক নিয়মে খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

গাজর কাঁচা খাওয়া

কাঁচা গাজরে ফাইবারের পরিমাণ বেশি থাকে; কারণ অতিরিক্ত সিদ্ধ করার মাধ্যমে এই তন্তুগুলো নষ্ট হতে থাকে। কাঁচা গাজর খেতেও দারুণ লাগে। তাই, কিছু গাজর স্লাইস করে কেটে আপনার অফিসে নিয়ে যেতে পারেন বা বাচ্চাদের স্কুলে স্ন্যাক হিসাবে দিয়ে দিতে পারেন।

রান্না করা গাজর

ফ্রেস ও কাঁচা গাজরের পাশাপাশি রান্না করা গাজর খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, বৈজ্ঞানিকদের অন্য গবেষণা থেকে জানা যায় যে, রান্না করা গাজরে কাঁচা গাজর অপেক্ষা উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকতে পারে।

আবার, কাঁচা গাজরের সাথে কম কার্বোহাইড্রেট আছে এমন অন্য সব্জিগুলোরও একটা সমতা রাখা জরুরী। গোস্তের ঝোল-ঝোল করকারী বা স্যুপের সাথে গাজরের কম্বিবেশন করতে পারেন; আবার, ভোজ্য নারিকেল তেলের সাথে গাজরকে হাল্কা ভেজেও সুস্বাদু বিকালের নাস্তাও তৈরী করতে পারেন।

গাজরের জুস

খাবারের তালিকায় গাজর রাখার একটি ফ্যান্টাসটি উপায় হল এর জুস তৈরী করা; কিন্তু ঘন-ঘন জুস তৈরী না করাই ভাল। কারণ, এতে গাজরের লম্বা ফাইবারের গঠন নষ্ট হয়ে যায়, আর জুস চিনির পরিমাণকে বাড়িয়ে দেয়।

পুষ্টি নষ্ট না করে গাজর সংরক্ষণের উপায়

ফ্রিজের সবচেয়ে শীতল অংশে গাজর সংরক্ষণ করুন। পেপার টাওয়েল বা প্লাস্টিক ব্যাগে রাখুন। এতে প্রায় ২ সপ্তাহ পর্যন্ত গাজর সংরক্ষণ করা যাবে। আর, খেয়াল রাখুব, নাসপাতি, আলু, বা আপেলের আশে-পাশে গাজর রাখবেন না। এভাবে রাখলে ফ্রিজে প্রবাহিত ইথিলিন গ্যাসের কারণে গাজরগুলো তিতা হয়ে উঠতে পারে।

গাজরের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও আছে!

অতিরিক্ত ভিটামিন এ এর উপস্থিতি শরীরে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। যদিও খাওয়ার মাধ্যমে এই বিষক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে খেয়াল রাখা উচিত, ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে শরীরে ভিটামিনের আধিক্য দেখা দেয়। শরীরে ক্যারোটিনের মাত্রা বেশী হলে চামড়ায় ঈষৎ কমলা রঙের ছোপ-ছোপ দাগের সৃষ্টি হতে পারে। তবে, সুখের বিষয় হল, এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়।

“তবে” টা বাদ দিলে গাজরের উপকারিতাই বেশি

দেহের জন্য যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পুষ্টি জোগান দিয়ে আসছে গাজর; তার নাম হল, বিটা-ক্যারোটিন। এ জন্যই গাজর যুগ-যুগ ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে।

এছাড়াও আরও অনেক অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের উৎস এই গাজর। এ থেকে পাওয়া যায় মানবদেহের জন্য অনেক প্রয়োজনীয় পুষ্টিও।

বিগত বছরগুলোতে, ক্যান্সার এবং অনেক কার্ডিওভাসকুলার রোগের চিকিৎসায় গাজর চমৎকার ফলাফল দেখিয়ে আসছে।

তাই, গাজরের মৌসুমে আমাদের খাদ্য তালিকায় যথেষ্ট পরিমাণে গাজর রাখা উচিত।


পড়ার মত আরও আছে

ক্যাটাগরিঃ স্বাস্থ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.