নিকোলা টেসলার ৭টি আবিষ্কার যা আলোর মুখ দেখেনি

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনিকোলা টেসলার ৭টি আবিষ্কার যা আলোর মুখ দেখেনি
Advertisements

বিজ্ঞানের জগতে নিকোলা টেসলার এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার পড়ে না। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি তার আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পৃথিবীর ২৭টি দেশে তার ২৭০টি আবিষ্কার পেটেন্ট করা হয়েছে; শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে ১১২টি পেটেন্ট। কিন্তু, শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর আবিষ্কারকের সব আবিষ্কারই কিন্তু বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি। তার রেকর্ড ঘেটে আমরা দেখেছি যে, টেসলার ৭টি আবিষ্কার রয়েছে যেগুলোর কোন প্রোটোটাইপ তিনি বাস্তবে তৈরী করেন নাই।

আসুন, টেসলার এই আবিষ্কারগুলো দেখে নেয়া যাক।

ওয়্যারলেস এনার্জি ট্রান্সমিশন (Wireless Energy Transmission)

Wireless Energy Transmission

বৈদ্যুতিক ফিল্ডে টেসলা’র অবাধ বিচরণ থেকে মনে হয় তিনি বিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণায় এক ধরণের অবশেসনে শিকার হয়েছেন। এ রকম ভাবনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। টেসলার পেটেন্টের বেশির ভাগই বৈদ্যুতিক আবিষ্কার নিয়ে। আর, বিদ্যুৎ আবিষ্কারের জন্য সকাল-বিকাল তাকে ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে – বাসা, অফিস, কল-কারখানা – সব কিছুই যে বিদ্যুতে চলছে।

আমাদের অনেকের হয়ত জানা নেই যে, তার সময় তিনি এমন একটি টাওয়ার নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন, যার মাধ্যমে তার বিহীন পদ্ধতিতে (wireless technology) ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন।

এই কাজে তিনি আমেরিকার বিখ্যাত অর্থলগ্নীকারী জে.পি. মরগ্যান’কে রাজি করিয়েছিলেন যাতে লং আইল্যান্ডের নর্থ উপসাগরে অবস্থিত ওয়ারডেনক্লিফ টাওয়ার থেকে বিদ্যুৎ বিতরণের কাজ শুরু করতে পারেন।

কিন্তু, পরবর্তীকে মরগ্যান পিছু টান দিলে টেসলার এই প্রজেক্টটি আলোর মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়।

ওয়্যারলেস ইলেকট্রিক টাওয়ারের বিদ্যুতে চালিত সুপারসনিক এয়ারশিপ (Supersonic Airships)

Supersonic Airships Powered by Wireless Electrical Towers

নিকোলা টেসলা চিন্তা-ভাবনায় তার সময়ের থেকে কয়েক দশক এগিয়ে ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমান সময়ে আমাদের প্রজন্ম তাদের ট্যাবলেট এবং স্মার্টফোনগুলো ওয়্যারলেস টেকনোলজিতে চার্জ দিতে পেরে ভাবছে এটি একটি প্রযুক্তির যুগান্তকারী ব্যবহার; কিন্তু, সেই ১৯১৯ সালে টেসলায় মাথায় খেলা করেছিল কিভাবে এমন একটি সুপারসনিক বিমান বানানো যেগুলোকে বিনা তারের বৈদ্যুতিক চার্জ দেয়া যেতে পারে।

মোবাইলের টাওয়ারের মাধ্যমে রেডিও সিগন্যাল ব্রডকাস্টের ধাঁচে বিদ্যুৎকেও ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ঐ বিমানগুলোকে চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা – এটাই ছিল নিকোলা টেসলার পরিকল্পনা।

বিমানগুলো ভূপৃষ্ট হতে ৪০,০০০ হাজার ফুট উপরে ঘণ্টায় ১,০০০ মাইল বেগে চলার উপযোগী করে তৈরী করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল – এই গতিতে ছুটে নিউইয়র্ক থেকে রওয়ানা দিয়ে লন্ডন পৌঁছাতে সময় লাগত ৪ ঘণ্টারও কম।

রিমোট কন্ট্রোল নৌবাহিনী (Remote Controlled Navies)

Remote Controlled Navies

নৌবাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র তৈরীতে নিকোলা টেসলাকে কিছু ব্যস্ত থাকতে দেখা গিয়েছে। যুদ্ধ নিয়ে নিকোলা টেসলার ফিলোসফির সাথে কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে ডিনামাইট আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল’র ফিলোসফি’র।

তার মতে, বিবাদমান দু’টি পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ ঠেকাতে হলে তাদের মধ্যে হয় যুদ্ধকে অর্থহীন করে দিতে হবে, অথবা, প্রতিপক্ষকে এত নির্মমভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতা টের পাইয়ে দিতে হবে যাতে তার যুদ্ধের খায়েশ মিটে যায়। তো নৌবাহিনীর জন্য তিনি এমন একটি নৌযান তৈরী করেন যা কিনা রেডিও সিগন্যাল দিয়ে দূরনিয়ন্ত্রন করা যেত – চালু করা, বন্ধ করা এবং দিক নিয়ন্ত্রন করা – সবই করা যেত।

টেসলা বিশ্বাস করতেন যে, যুদ্ধের হিসাব থেকে যদি মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়, তবে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে যুদ্ধযান তৈরীর কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো বিধবংসী ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজগুলো মরিচা ধরা লোহার পিণ্ডে পরিণত হবে।

চিন্তাক্ষমতাযুক্ত ক্যামেরা (The Thought Camera)

Tesla Thought Camera

[adinserter block=”1″]

টেসলার চিন্তাভাবনার গভীরতা ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন, মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনাকে ফটোগ্রাফ আকারে বের করে আনবেন।

১৯৩৩ সালে কানসাস সিটি জার্নাল-পোস্টের এক সাংবাদিককে টেসলা বলেছিলেন, “১৮৯৩ সালে একটি ইনভেস্টিগেশনে কাজ করার সময় আমি বেশ চমকপ্রদ হয়েছিলাম এই ভেবে যে, মানুষ যখন বাস্তবে কোন কিছু করবার চিন্তা করে, তা করার পূর্বে মস্তিষ্কে চিন্তা করে; এর একটি চিত্র মস্তিষ্কে দেখে নেয় – মস্তিষ্কে চিন্তা করা এবং বাস্তবে তা করে দেখা, এটা যুগপৎভাবে সংঘটিত হয় – মস্তিষ্কের এই চিন্তাভাবনা মানুষের চোখের রেটিনাতে দেখা যায় যা সুবিধাজনক কোন যন্ত্র দিয়ে পড়ে ফেলা সম্ভব। তর্কের খাতিরের যদি ধরে নেয়া যায় যে, মানুষের চিন্তাভাবনা রেটিনায় প্রতিফলিত হয় – তাহলে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যে এটিকে ছবি আকারে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব কিনা – আরও ভাল হয় যদি এই চিন্তাভাবনাকে স্ক্রিনে প্রদর্শন করা সম্ভব কিনা!

আর যদি এটা বাস্তবে দেখানো সম্ভব হয়, তবে মানুষ যা মনের মধ্যে চিন্তা করবে তা যদি স্ক্রিনে দেখানো সম্ভব হয়, এভাবে মানুষের প্রতিটি চিন্তাভাবনাকে পড়ে ফেলা সম্ভব হবে। আমাদের মনের ভাবনাগুলো হয়ে উঠবে গল্পের বইয়ের মত ফেইরি টেল বা রঙ্গীন কল্পনার রঙ্গীন বই।

আর্থকুয়াক বা ভূমিকম্প মেশিন (The Earthquake Machine)

Tesla Earthquake Machine

সেই ১৮৯৩ সালেই আবার নিকোলা টেসলার আরেকটি পেটেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী হন – তা হলো স্টীম-চালিত যান্ত্রিক ওসিলেটর (steam-powered mechanical oscillator)। কি কাজ করত এই মেশিন? এই মেশিনের মধ্যে উৎপাদিত ঝাঁকুনি থেকে বিদ্যুৎ তৈরী করার পরিকল্পনা করলেন টেসলা।

সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করার জন্য তিনি মেশিনকে সঠিকভাবে ক্যালিব্রেশন করে নিলেন এবং চালিয়ে দিলেন। দেখা গেল, এই মেশিনের কাপুঁনিতে তার নিউ ইয়র্ক সিটি’র ল্যাবরেটরী বিল্ডিংটি এমনভাবে কেঁপে উঠল, মনে হচ্ছিল যে, বিল্ডিংটি এখনই ভেঙ্গে পড়বে।

টেসলার মনে হল, “হঠাৎ করে ওখানকার সব ভারী মেশিনারীগুলোর উড়তে শুরু করল। আমি একটা হাতুড়ি দিয়ে আমার ওসিলেটরটি ভেঙ্গে দিলাম। তা না হলে, এমন ঝাঁকুনি হচ্ছিল মনে হচ্ছিল যে, আর কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে বিল্ডিংটা ভেঙ্গে পড়বে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরীর বাইরের মানুষজনের হৈচৈ, জটলা তৈরী হয়ে গেছে। চলে এসেছে পুলিশ আর এ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু, টেসলার তার সহকারীকে ডেকে সাবধান করে দিলেন যাতে পুলিশকে কিছু না বলা হয়। পুলিশদেরকে বলা হল, আশে-পাশে ভূমিকম্পের কারণে এ রকম হয়েছে। পুলিশের এর চেয়ে বেশী কিছু না জানলেও চলবে”।

এই এক্সপেরিমেন্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে টেসলা ধারণা করেছিলেন টেলিজিওডায়নামিক অসিলেটর তৈরীর আইডিয়া বা ভূমিকল্প তৈরীর মেশিন। কিন্তু, এই মেশিন বাস্তবে তৈরী করতে সফলতার মুখ দেখেননি তিনি। পরবর্তীতে টেসলার অসিলেটরের ধারণার উপরে ভিত্তি করে ভূমিকম্পের তীব্রতা মাপার যন্ত্র রিখটার স্কেল তৈরী হয়।

কৃত্রিম জোয়ারের ঢেউ তৈরীর যন্ত্র (Artificial Tidal Waves)

টেসলা এমন ধবংশাত্মক অস্ত্র তৈরীর আইডিয়াকে বাস্তবে নিয়ে আসার ক্ষমতা ছিল যার কাছে আণবিক বোমার ধবংশ ক্ষমতাও নেহাতই শিশু। কিন্তু, তার আইডিয়াগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার মুখ দেখে নাই। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বহিঃশত্রুর নৌ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার আবিষ্কৃত এই কৃত্রিম জোয়ারের আইডিয়াটা খুব ভাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে।

তার বিশ্বাস এমন ছিল যে, সমুদ্র দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রুও সর্বশক্তি দিয়ে প্রচলিত সমরাস্ত্রগুলো নিয়ে আক্রমণ করলেও তার নতুন এই অস্ত্রের আইডিয়া সেগুলোকে ধূলিসাৎ করে দিবে। এই জন্য তিনি চিন্তা করেছিলেন এমন কিছু তৈরীর যা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

এই যন্ত্রগুলোতে বোঝাই করা থাকবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক; শত্রু নৌ-জাহাজের কাছে গিয়ে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ফাটিয়ে দেয়া হবে। টেসলা ধারণা করেছিলেন, শত্রু জাহাজ থেকে ১ মাইল দূরের এই বিস্ফোরণ থেকে তৈরী হবে ১০০ উচ্চতার ঢেউ যার ধাক্কায় কুপোকাত হবে শত্রুর নৌযানগুলো।

দ্য ডেথ রে (The Death Ray)

These 7 Inventions Of Nikola Tesla Never Became A Reality

টেসলার এই রশ্মির নাম দিয়েছিলেন “শান্তির রশ্মি” বা Peace Ray। Mercury বা পারদের তেজস্ক্রিয় কণাকে (isotope) কে শব্দের গতির চাইতে ৪৮ গুণ বেশী জোরে দৌড়ানি দিলে যে শক্তিশালী গতিশীল রশ্মির ধারা (beam) তৈরী হবে, তা দিয়ে নিরাপদ দূর থেকে সৈন্যবাহিনীর পুরো একটা দলকে ধবংস করে ফেলা যাবে।

পৃথিবী যদি গোল না হয়ে সমতল হত, তবে এই রশ্মি সক্ষমতা ছিল পৃথিবীর পরিধি ভেদ করে যেতে পারত সুদূরে; আর এর সামনে যা পড়ত, সবই ধূলিসাৎ হয়ে যেত।

তার এই নতুন আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য তিনি অনেকের দারস্ত হয়েছিলেন; এমনকি তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন এক গবেষণাগারে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। কিন্তু, বিধি বাম! তার এই আইডিয়াকে তিনি সফলতার মুখ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

পড়ার মত আরও আছে

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.