দিনের বেলা ঘুম ঘুম ভাব হওয়ার কারণ কি?

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaলাইফস্টাইলদিনের বেলা ঘুম ঘুম ভাব হওয়ার কারণ কি?

প্রায় প্রত্যেকেরই জীবনেই এমন অনেক দিন আসে যখন দিনের বেলা ঘুম ঘুম ভাব হয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দিনের বেলা প্রাত্যহিক কাজের মধ্যে, ছেলে-মেয়ের যত্ন নেয়ার সময়, এমনকি আরাম করে শুয়ে-বসে থাকার মাঝেও ঘুমের ঘোরে নিদ্রা চলে আসে। এটি হাইপারসমনিয়া হিসাবে পরিচিত, বারবার ঘুমের ফলে লোকেরা বার বার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন – এমনকি কর্মক্ষেত্রেও এই বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে।

মজার ব্যাপার হল, দিনের বেলা ঘুমাচ্ছন্ন হওয়ার সমস্যাটি সাধারণতঃ রাতে শুর হয়! এমনকি মাত্র কয়েক রাতে ঠিক মত ঘুম না হওয়া, বা নিরবচ্ছিন্ন পর্যাপ্ত ঘুমাতে না পারায় আপনার কাজ করার ইচ্ছা শক্তিকে স্থবির করে দিতে পারে এবং আপনার মেজাজকে সপ্তমে তুলে দিতে পারে।

অপর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস প্রায়শই দিনের বেলা ঘুমের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দিনের বেলা ঘুমে টলায়মান হয়ে নিরশ দিনাতিপাত আর না করতে চাইলে, রাতের ঘুমের উন্নতি করতে এবং দিনের ঘুমের ভাব এড়াতে এই ১২টি উপায়ের সাথে আপনার জীবনকে অভ্যাস্ত করাতে পারেন।

১। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম দিন

আমরা অনেকেই রাত্রি বেলা বা সকালে না ঘুমিয়ে এটা-সেটা করে ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় নষ্ট করে ফেলি। কোন প্রয়োজন নাই এমন অপ্রয়োজনীয় কাজ করি, যেটা না করলেও চলত। ঐ সময়টা ঘুমের জন্য ব্যয় করতে পারতাম।

বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কদের রাতে সাত থেকে নয় ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়; কিন্তু, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে সাধারণত পুরো নয় ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়।

২। ঘুমের ব্যাঘাত হয় এমন জিনিষ বিছানা থেকে দূরে রাখুন

University of Maryland of Medicine ডিপার্টমেন্টের ডক্টরেট প্রফেসর এবং Sleep medicine ফেলোশিপ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর Avelino Verceles, MD বলেন,

“Reserve your bed for sleep and sex”. “You shouldn’t read, watch TV, play video games, or use laptop computers in bed.”

আপনার হিসাবপাতি বিছানায় বসে করবেন না। আর, জীবনসঙ্গীর সাথে কথা-কাটাকাটিগুলো বিছানায় টেনে আনবেন না। এই অভ্যাসগুলোর আপনার রাতে ঘুমকে কেড়ে নিবে – এগুলোর আপনার সারা রাত জেগে থাকার কারণ হবে।

৩। নিয়ম বেধে সকালে ঘুম থেকে উঠুন

যাদের ঘুমে সমস্যা হয় তাদের প্রায়শই সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলি সহ প্রতিদিন বিছানায় যেতে এবং একই সাথে উঠতে পরামর্শ দেওয়া হয়। Maimonides Sleep Arts and Sciences Ltd. এর MD এবং মেডিকেল ডিরেক্টর Barry Krakow পরামর্শ দিয়েছেন, “তবে যে কোন একটি আদর্শ সময়ে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়াটা আরও হতাশার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যারা অনিদ্রা ও ঘুম না আসার সমস্যা রয়েছে। “Sound Sleep, Sound Mind: 7 Keys to Sleeping Through the Night” বইতে Barry Krakow এ ব্যাপারে বিষদ আলোচনা করেছেন।

আরও পড়ুন:  পুরুষের ১১টি গুণাবলী যা নারীদের আকৃষ্ট করে

এর পরিবর্তে, ক্র্যাকো শুধুমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠবার সময় সেট করে শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন।

“Stick by that for the first few weeks or even months to establish a rhythm,”

Barry Krakow

“সব সময় একই সময়ে জেগে ওঠার এই প্রক্রিয়াটি circadian তালের সাথে নিজেকে আত্মস্থ করতে সাহায় করে, এবং যদি আপনি এটি করেন এবং আপনার এক রাতে ভাল ঘুম না হয়ে, আপনি পরের বার শোবার সময় আরও ভাল ঘুম দিতে পারবেন।”

৪। ধীরে ধীরে ঘুমানোর সময় এগিয়ে আনুন

প্রতিদিন যে সময় ঘুমাতে যাচ্ছেন আগামী ৪ রাতে আপনার ঘুমানোর সময় ১৫ মিনিট করে এগিয়ে আনুন। চতুর্থ রাতে যে সময় ঘুমাতে যাচ্ছেন, চেষ্টা করুন সেই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাসটা ধরে রাখতে। একেবারে হঠাৎ করে এক ঘণ্টা আগে ঘুমাতে না গিয়ে বরং ধীরে ধীরে ঘুমাতে যাওয়ার সিডিউল ঠিক করলে। তা আপনার জন্য ভাল কাজ করবে এবং সুফল বয়ে আনবে।

৫। প্রতিদিন এক সময়ে খাবার খান (consistent, healthy mealtimes)

প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস, একই সময় ঘুমানোর অভ্যাসের মত, আমাদের শরীরের শরীরবৃত্ত্বীয় কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় স্থির করুন – এই সময়েই সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবার খাবেন।

সকালের নাস্তায় একটা মামলেট মুখে দিয়ে ঢক ঢক করে চা বা কফি খেয়ে নাস্তা শেষ করা, বা বাসি স্যান্ডউইচ খেয়ে বাহিরে দৌড় দেয়া – এই ধরণের খাদ্যাভাসে সারা দিন আপনার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগানে ঘাটতি ফেলব, আর এতে আপনার ঘুমের সমস্যাকে দূর করবে না, বরং আরও বাড়িয়ে দিবে। রাতে চেষ্টা করুন, বিছানায় যাওয়া অন্ততঃ ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে খাবারের পাট চুকিয়ে ফেলতে।

৬। ব্যায়াম করুন (Excersize)

ভাল ঘুম পেতে চান? তাহলে, প্রতিদিন ব্যায়াম করুন।

আরও পড়ুন:  দিন শেষে নিজেকে তরতাজা রাখবেন যেভাবে

কিন্তু, কতক্ষণ ব্যায়াম করবেন? চিকিৎসগণ ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার জন্য বলে থাকেন। এ্যারোবিক ব্যায়াম (ছন্দের তালে তালে), যা আসলে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ, করলে তাড়াতাড়ি ঘুম আসবে – এই ঘুম হবে প্রগাঢ়, প্রশান্তিময়।

5-Minute Cardio Workout by DoctorOz YouTube Channel

অনুশীলন আপনাকে দিনের আরও শক্তি যোগাবে এবং আপনার চিন্তাভাবনা তীক্ষ্ন রাখবে। এবং, আপনি আরও বেশি সুবিধা পাবেন, যদি আপনি দিনের আলোতে ব্যায়াম করেন।

ঘুম বিশেষজ্ঞরা (Sleep expert) দিনে ৩০ মিনিটের জন্য সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসার পরামর্শ দেন, কারণ, দিবালোক আমাদের ঘুমের ধরণগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।

৭। আপনার সময়কে আরেকটু গুছিয়ে নিন

“আপনি যদি মনে করেন যে, দিনে সাত বা আট ঘণ্টা ঘুমানোর সময় বের করতে পারবেন, সে ক্ষেত্রে আপনি আপনার সময়কে কিভাবে ব্যবহার করছেন সে দিকে একটু খেয়াল করুন এবং সময়সূচীতে খানিকটা এদিক-ওদিক করে সিডিউল ঠিক করে নিতে পারেন”

Verceles বলেন।

“রাতের কিছু কাজকে বিকালের দিকে নিয়ে আসেন। কিংবা, ভোরে উঠে সে কাজগুলো করেন, সেগুলোকে আরেকটু পিছিয়ে দিন”

কিছু অহেতুক কাজগুলোকে একেবারে ঝেড়ে ফেলুন।

রাতে পর্যাপ্ত ঘুম পেতে হলে আপনার অবশিষ্ট কাজগুলির সময় আপনাকে আরও ভালভাবে কাজ সমাধা করতে সহায়তা করবে।

কারণ একটাই। আপনার চাই প্রগাঢ় ঘুম।

৮। ঘুম না আসা অবধি বিছানায় যাবেন না

Krakow এর অভিমত হল,

“একেবারে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিছানায় যাবেন না; কারণ হল, এতে আপনি বিছানায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়তে পারবেন না”

“আপনাকে বুঝতে হবে কখন আপনার ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছে এবং কখন আপনি ক্লান্ত। বিছানায় তখনই যান, যখন আপনি একবারে ক্লান্ত হয়ে উঠেছেন – চোখ ঢুলু-ঢুলু হয়ে পড়ছে, ঘুমে আপনার মাথা ঘুরছে, আপনার মনে হচ্ছে যে, আপনি উল্টে পরে যেতে পারেন। এই অনুভূতিটা একেবারেই আলদা।”

৯। বিকালে তন্দ্রা না দেয়া

দিনের শেষে অর্থাৎ বিকালের তন্দ্রা বা হালকা ঘুম দিলে আপনার ঘুম ঘুম ভাবটা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। কারণ একটাই। এই তন্দ্রা আপনার রাত্রিকালীন ঘুমকে প্রভাবিত করবে।

১০। ঘরের পরিবেশকে ঘুমের উপযোগী করে তুলুন

শোবার আগে একটা সময়কে আলাদা করে ফেলুন যেখানে আপনি একটু রিলাক্স হয়ে বসতে পারেন, বিশেষ করে যে দিনটিতে আপনার একটু বেশী ধকল গেছে যা আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

হালকা গরম পানিতে শরীর ছেড়ে দিয়ে একটু মেডিটেশনের চেষ্টা করতে পারেন – এর সাথে একটু সফট মিউজিকও ছেড়ে দিতে পারেন। চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন প্রিয় বই থেকে দুই-এক পাতা।

আরও পড়ুন:  ১৫টি Indoor Plant যা আপনার ঘরকে করবে আরো প্রাণবন্ত

এক কাপ ভেষজ চা বা উষ্ণ দুধও কাজের হতে পারে, তবে খেয়াল রাখবেন, এই তরল পানীয়গুলো এড়িয়ে যাওয়াই ভাল যদি এগুলো পানের কারণে আপনাকে মাঝরাতে উঠে বাথরুমে যেতে হয়।

১১। এলকোহল এড়িয়ে চলুন

অনেকের ধারনা, রাতে শোয়ার আগে একটু এলকোহল পানে ভাল ঘুম হয়। এটি ভুল ধারণ। এলকোহল পান আপনার প্রগাঢ় ঘুমকে ছিনিয়ে নিবে যা সকালে শরীরের সতেজতার জন্য অপরিহার্য ছিল।

রাতে যখন অ্যালকোহলের প্রভাব কেটে যায়, সম্ভবত আপনার ঘুম আবার ভেঙ্গে যেতে পারে।

১২। একজন ঘুম স্পেশালিস্টের সাথে পরামর্শ করুন

ঘুমের ব্যাধিজনিত (sleep disorder) কারণে দিনের বেলা ঘুম আসে। রাতে ভাল ঘুমালেও আপনার যদি দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব আসে, বা প্রতিদিনের কাজের সময় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন, তবে আপনার ঘুমের ব্যাধি হতে পারে যেমন নারকোলেপসি (narcolepsy) বা, ঘুমের সময় ঘটে যাওয়া শ্বাসকষ্টের সমস্যা, যাকে বলে, স্লিপ অ্যাপনিয়া (sleep apnea)।

Krakow এর মতে, ঘুমের ব্যাধিজনিত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না করা হলে ঘুমজনিত সমস্যাগুলোর কারণে সম্ভবত দিনের বেলা ক্লান্তি এবং ঘুম ঘুম ভাব হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।

কিছুটা অসুস্থতা ও ওষুধের কারণেও ঘুমের সমস্যা হতে পারে। এবং মানসিক অবস্থা যেমন হতাশা (depression), পোস্টট্রোম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (posttraumatic stress disorder) এবং উদ্বেগ (anxiety) – এগুলোকে ঘুমের সমস্যার জন্য সাধারণভাবে দায়ী করা হয়।

একটি ঘুম বিশেষজ্ঞ আপনার জন্য একটি চিকিৎসা প্যাকেজ ডিজাইন করে দিতে পারেন, যা আপনার ঘুমের সমস্যা আসল কারণকে দূর করে দিতে পারে এবং আপনার জন্য আগের থেকে ভাল ঘুমানোর একটি অভ্যাস তৈরী করে দিতে পারেন।

ভাল ঘুমের জন্য অনেক সময় শুধু ঔষুধ নয়; এর পাশাপাশি মানুষের আচরণগত অভ্যাসও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়।


আশা করি এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে বিভিন্ন সময়ে দিনের বেলা ঘুম ঘুম ভাব দুর হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন:

ক্যাটাগরিঃ লাইফস্টাইল