পৃথিবীর ১১টি সবচেয়ে দ্রুতগামী মিলিটারী ফাইটার প্লেন

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিপৃথিবীর ১১টি সবচেয়ে দ্রুতগামী মিলিটারী ফাইটার প্লেন
Advertisements

১৯০৩ সালে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বানানো প্রথম বিমানের যুগান্তকারী উড্ডয়নেরসেই উত্তেজনাকর সময় থেকে কালের পরিক্রমায় উড়োজাহাজ বিদ্যায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হযেছে। প্রথম বিমান উড়ানোর শত বছর পরে নর্থ ক্যারোলিনায় আমরা দেখছি বৈদ্যুতিক বিমান, কিটি হক, আর দেখেছি প্রকৌশলীদের হাতে তৈরী হওয়া এমন বিমান যেগুলো আকাশে অনেক উঁচু দিয়ে শব্দের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ দ্রুত গতিতে ছুটে যেতে পারে। উইলবার ও অরভিল রাইট (Wilbur and Orville Wright) ভাতৃদ্বয় হয়তো এতটা হয়তো কল্পনাও করে যেতে পারেননি।

এই লেখা পাঠকদের জন্য তুলে আনা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী ১১টি সুপারসনিক মিলিটারী ফাইটার প্লেনের কথা।

এফ-৩৫ লাইটনিং ২ (F-35 Lightning II)

যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারীর জন্য তৈরী করা “এফ-৩৫ লাইটনিং ২ (F-35 Lightning II)” ফাইটার জেটকে বলা হয় পরবর্তী প্রজন্মের ফাইটার জেট। উজোজাহাজ প্রযুক্তি বিদ্যার সর্বশেষ প্রযুক্তি দিয়ে বানানো হয়েছে এফ-৩৫ সিরিজের বিমানগুলিকে।

এফ-৩৫ লাইটনিং ২ (F-35 Lightning II)

এতে ব্যবহার করা হয়েছে সিঙ্গেল ইঞ্জিন। একজন বৈমানিক নিয়ে উড়তে সক্ষম এই ফাইটার জেটপ্লেনে রয়েছে সর্বাধুনিক স্টিলথ সক্ষমতা (stealth capabilities), আর রয়েছে, উন্নততর বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সেন্সর।

এফ-৩৫ লাইটনিং ২ এর গতিবেগ ১.৬ ম্যাক (Mach)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি শব্দের চেয়ে ১.৬ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। আরও সহজভাবে বলা যায়, এই ফাইটার জেট প্লেনটির গতি ঘণ্টায় প্রতি প্রায় ১,২০০ মাইল বা ১,৯৩০ কিলোমিটার।

এফ-৩৫ লাইটনিং ২ (F-35 Lightning II)

অ্যাভিয়োনিকসের সর্বোচ্চ সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে সক্ষম এই বিমান তৈরীর পথ মোটেই মসৃন ছিল না। এর উৎপাদনে অনেক কাল বিলম্ব হয়েছে এবং অবিশ্বাস্য রকমের ব্যয়বহুল এই ফাইটার প্লেনটি। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও মেরিনে ব্যবহৃত এফ-১৫, এফ-১৬ ও এফ-২২ এর কার্যকারিতা যদিও এখন অটুট রয়েছে, তবে বয়সের ভার থেকে মুক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও মেরিন কর্পগুলোর জন্য নতুন ভরসা হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে এই এফ-৩৫ লাইটনিং ২ বিমানগুলো।

এসইউ-২৭ ফ্ল্যাঙ্কার (Su-27 Flanker)

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলে তৈরী দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট ফাইটার প্লেন, সুখোয় এসইউ-২৭ (Sukhoi Su-27)। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী উন্নত ফাইটার প্লেনের সাথে পাল্লা দিতে তৎকালীন সুপারপাওয়ার সোভিয়েতদের আবিষ্কার ছিল এটি। এসইউ-২৭ প্রথম আকাশে ডানা মেলে ১৯৭৭ সালের মে মাসে এবং খাতাকলমে ১৯৮৫ সালে সোভিয়েন বিমান বাহিনীর সেবায় নিয়োজিত হয়।

এসইউ-২৭ ফ্ল্যাঙ্কার (Su-27 Flanker)

এই ফাইটার প্লেনগুলোর সর্বোচ্চ সুপারসনিক গতিবেগ ২.৩৫ ম্যাক, যা ঘণ্টায় প্রায় ১,৫৫০ মাইল বা ঘণ্টায় ২,৫০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ বিমানটি শব্দের চেয়ে ২.৩৫ গুণ বেশি জোরে ছুটতে পারে।

তৎকালীন সময়ে পৃথিবীতে যতগুলো ফাইটার প্লেন আকাশে উড়েছে, তাদের মধ্যে অসাধারণ উ্ড্ডয়ন নিপুণতার জন্য Su-27 এর বিশেষ খ্যাতি ছিল। হাল আমলেও এই বিমানের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায় নি। রাশিয়াসহ বেলারুশ ও ইউক্রেনের বিমান বাহিনীতে এখনও সগৌরবে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে।

এফ-১১১ আর্ডভার্ক (F-111 Aardvark)

জেনারেল ডিনামিক্সের তৈরী এফ-১১১ আর্ডভার্ক’কে তৈরী করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর জন্য। ১৯৬০ সালে তৈরী হওয়ার পরে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে কৌশলগত বোমিং মিশনে, শত্রু অবস্থানের খবর সংগ্রহ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের জন্য একে ব্যবহার করা হয়।

এফ-১১১ আর্ডভার্ক (F-111 Aardvark)

দুই জন পাইলট দ্বারা চালিত এফ-১১১ ফাইটার প্লেনের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২.৫ ম্যাক (১,৬৫০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ২,৬৫৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা), অর্থাৎ এটিও শব্দের চেয়ে ২.৫ গুণ গতিবেগ নিয়ে ছুটে চলতে সক্ষম ছিল।

ভিযেতনামের উপরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে এফ-১১১ আর্ডভার্ককে বিস্তর বোম্বিং এর কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে, ১৯৯৮ সালে এই ফাইটার বিমানটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সার্ভিস থেকে অবসরে পাঠানো হয়।

এফ-১৫ ঈগল (F-15 Eagle)

১৯৬৭ সালে দুই-ইঞ্জিন বিশিষ্ট এফ-১৫ ঈগল বিমানকে কৌশলগত ফাইটার প্লেন হিসাবে উৎপাদন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকডোনাল্ড ডগলাস কোম্পানী। যে কোন আবহাওয়াতে উড্ডয়নের উপযোগী করে তৈরী করা হয় এই বিমানকে। এ গুলোকে এমন ভাবে ডিজাইন করা হয়, যাতে মূলত: তৎকালীন শত্রু জঙ্গী বিমানের বিরুদ্ধে আকাশ যুদ্ধে ডমিনেটিং পজিশন ধরে রাখতে পারে।

এফ-১৫ ঈগল (F-15 Eagle)

এফ-১৫ ঈগল বিমানকে প্রথম বারের মত আকাশে উড়ানো হয় ১৯৭২ সালে এবং ১৯৭৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী অফিসিয়ালি সার্ভিস দেয়া শুরু করে।

এফ-১৫ বিমানগুলোর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল, এদের গতিবেগ ২.৫ ম্যাক এর চেয়েও বেশি ছিল (১,৬৫০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ২,৬৫৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা)। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে সার্ভিস দেয়া বিমানগুলোর এগুলোর সর্বাপেক্ষা চৌকষ।

এই সক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর পরিকল্পনা মোতাবেক এফ-১৫ ঈগল ফাইটার প্লেনগুলো ২০২৫ সাল পর্যন্ত সার্ভিস দিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও তার কৌশলগত মিত্র জাপান, ইসরাইল ও সৌদী আরবে বিমান বাহিনীতে এফ-১৫ ঈগল রয়েছে।

মিগ-৩১ ফক্সহাউন্ড (MiG-31 Foxhound)

উচ্চ গতিশীল শত্রু জঙ্গীবিমানকে আকাশে মাঝপথে ধাওয়া করার লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে তৈরী হয় মিকোয়ান মিগ-৩১ ফক্সহাউন্ড ফাইটার প্লেন। এটি একটি বিশাল দেহের দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট সুপারসনিক এয়ারক্রাফট। বিমানটি পরিচালনার জন্য দুই জন বৈমানিকের প্রয়োজন হত।

মিগ-৩১ ফক্সহাউন্ড (MiG-31 Foxhound)

১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম আকাশে ডানা মেলে এবং ১৯৮২ সালে সোভিয়েত এয়ার ডিফেন্স ফোর্সের সার্ভিসে নিযুক্ত করা হয় মিগ-৩১ ফক্সহাউন্ডকে।

মিগ-৩১ ফাইটার জেটগুলোর প্রস্তুতকারী কোম্পানীর ঘোষণা অনুযায়ী, এগুলো ২.৮৩ ম্যাক স্পীডে উড়তে পারত (১,৮৬০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ৩,০০০ কিলোমিটার/ঘণ্টা)। এগুলো আকাশের অনেক নীচুতে নেমে এসেও তাদের সুপারসনিক গতি ঘরে রাখতে পারত। মিগ-৩১ এর এমন চৌকষ বৈশিষ্ট্যের কারণে রাশিয়ার বিমান বাহিনীতে এখন রাখা হয়েছে এগুলোকে।

এক্সবি-৭০ ভালকারি (XB-70 Valkyrie)

১৯৫০ সালের শেষের দিকে অতিকায় ছয়-ইঞ্চিন বিশিষ্ট এক্সবি-৭০ ভালকারি ফাইটার বিমান তৈরী করে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ অ্যামেরিকান অ্যাভিয়েশন কোম্পানী। পরমাণু বোমা হামলা করতে সক্ষম এই বিমানকে কৌশলগত কাজে ব্যবহার জন্য প্রোটোটাইপ আকারে তৈরী করা হয়।

এক্সবি-৭০ ভালকারি (XB-70 Valkyrie)

সুপারসনিক গতিতে ছুটে চলার সক্ষমতা দিয়ে তৈরী করা এই বিমানকে ১৯৬৫ সালের অক্টোবর ১৪ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাডওয়ার্ড বিমান বাহিনীর ঘাটি থেকে আকাশে উড়ানো হয়। এ দিন বিমানটি ম্যাক ৩.০২ গতিতে (২,০০০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ৩,২১৯ কিলোমিটার/ঘণ্টা) উড়তে সক্ষম হয়েছিল। আর, এ ঘটনাটি ঘটে আকাশের ৭০,০০০ ফুট (২১,৩০০ মিটার) উপরে।

[adinserter block=”1″]

প্রোটোটাইপ হিসাবে দুটো এক্সবি-৭০ বিমান তৈরী করা হয় এবং ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সুপারসনিক গতির পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বারংবারং তাদেরকে উড়তে দেখা যায়। তবে, দু:খের বিষয় হল, ১৯৬৬ সালে মধ্য আকাশে সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হয় একটি এক্সবি-৭০ বিমান। অবশিষ্টটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যের ডেটন এ অবস্থিত ন্যাশনাল মিউজিয়ামে দর্শনার্থীদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

বেল এক্স-২ “স্টারবাস্টার” (Bell X-2 “Starbuster”)

যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্স ও ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ফর অ্যারোনটিকস (নাসা) এর সহযোগিতায় বেল এক্স-২ কে গবেষণা ও তৈরী করার দায়িত্ব পায় বেল এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন (Bell Aircraft Corporation)। এবার বেল এক্স-২ এর সাথে জুড়ে দেয়া হয় রকেট-পাওয়ারড ইঞ্জিন। শব্দের গতিতে ছুটে চলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের আগের সুপারসনিক বিমানগুলোতে যে সকল ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, সেগুলো কি ভাবে কাটিয়ে উঠা যায়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য এই প্লেনটি তৈরী করা হয়েছিল।

বেল এক্স-২ “স্টারবাস্টার” (Bell X-2 "Starbuster")

এছড়াও, শত্রুপক্ষের সমসাময়িক সুপারসনিক ফাইটার প্লেনগুলোর সাথে পাল্লা দিতে সুপারসনিক গতি কিভাবে ম্যাক দুই থেখে তিনের মধ্যে রাখা যায়, সেটাও নিশ্চিত করার দরকার হয়ে পড়েছিল।

যা হোক, “স্টারবাস্টার” খেতাবপ্রাপ্ত এক্স-২ এর উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষে ১৯৫৫ সালের নভেম্বর মাসে একে আকাশে উড়ানো হয়। পরের বছর, ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বৈমানিক ক্যাপ্টেন মিলবার্ন আপ্ট (Caption Milburn Apt) এক্স-২ কে ৬৫,০০০ ফিট উচ্চতা দিয়ে উড়ানোর সময় ম্যাক ৩.২ গতি (২,০৯৪ মাইল/ঘণ্টা, বা, ৩,৩৭০ কিলোমিটার/ঘণ্টা) তুলতে সক্ষম হন।

প্লেনটি যখন গতিতে বিশ্বরেকর্ড করেছিল, বৈমানিক আপ্ট ম্যাক ৩ গতিতে বিমানটিকে এক দিকে বাঁক নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু, তিনি বিমানটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন আকাশে ভয়ঙ্করভাবে চক্কর খেতে থাকে। বেল আউট করে আপ্ট বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এই ট্র্যাজিক দূর্ঘটনার পর এক্স-২ প্রোগ্রাম বাতিল ঘোষণা করা হয়। দূর্ঘটনার পূর্ব পর্যন্ত এক্স-২কে বিশ বারের মত টেস্ট ফ্লাইটের জন্য আকাশে উড়ানো হয়।

মিগ-২৫ ফক্সব্যাট (MiG-25 Foxbat)

শত্রু বিমানকে মাঝপথে বাঁধা দেয়া এবং শত্রু দেশের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার লক্ষ্যে মিকোয়ান-গুরেভিচ মিগ-২৫ ফক্সব্যাট তৈরী করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরী এই বিমানটি ছিল তৎকালীণ সময়ে বিমান বাহিনী সার্ভিসে থাকা সর্বোচ্চ গতির ফাইটার প্লেন।

মিগ-২৫ ফক্সব্যাট (MiG-25 Foxbat)
Source: kerbalx.com

১৯৬৪ সালে সফলতার সাথে মিগ-২৫ তার প্রথম উ্ড্ডয়ন সম্পন্ন করে এবং ১৯৭০ সালে প্রথম বারের মত সোভিয়েত এয়ার ডিফেন্স ফোর্সের সার্ভিসে ব্যবহার করা হয়।

বিমানটি ম্যাক ৩.২ এর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছুটতে সক্ষম ছিল, যেটা ছিল ঐ সময়কার বিশ্ব রেকর্ড (২,১৯০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ৩,৫২৪ কিলোমিটার/ঘণ্টা)। বর্তমানে রাশিয়ান এয়ার ফোর্সের কয়েকটি ইউনিটে মিগ-২৫কে এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। রাশিয়া গুটি কয়েক মিত্র দেশের কাছে মিগ-২৫ কে বিক্রয় করেছিল। তাদের মধ্যে আলজেরিয়া ও সিরিয়ার নাম উল্লেখযোগ্য।

লকহিড ওয়াইএফ-১২ (Lockheed YF-12)

যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড কর্পোরেশনের হ্যাঙ্গারে ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত গবেষণা থেকে যে সুপারসনিক ফাইটার প্লেনটি তৈরী হয়, তার নাম ছিল “ওয়াইএফ-১২”। এটি ছিল একটি প্রোটোটাইপ বিমান। মূলত রাশিয়ার সুপারসনিক ফাইটারকে মাঝ পথে বাঁধা দেয়ার লক্ষ্যে ম্যাক ৩ গতির একটি প্লেনটি বানানো হয়।

লকহিড ওয়াইএফ-১২ (Lockheed YF-12)

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের অঙ্গরাজ্য নেভাদার মরুর এলাকায় এয়ারফোর্সের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠা রহস্যময় একটি সামরিক স্থাপনা “এরিয়া ৫১ (Area 51)”। এখানেই ওয়াইএফ-১২ এর টেস্ট ফ্লাইটগুলো পরিচালনা করা হয়। ওয়াইএফ-১২ এর টেস্ট ফ্লাইটের সময় এ-১২ নামে লকহিডের আরও একটি প্লেনকে উড়ানো হয়। এ-১২ ছিল একটি গোয়েন্দা (reconnaissance aircraft) বিমান। সিআইএ’র (CIA) ফরমাইসে এই গোয়েন্দা বিমানটি তৈরী করা হয় এবং ওয়াইএফ-১২ এর উড়িয়ে টেস্ট করা হয়।

যা হোক, ১৯৬৩ সালে ওয়াইএফ-১২ এর সুপারসনিক গতির পরীক্ষার জন্য আকাশে উড়ানো হয়। প্রথম টেস্ট ফ্লাইটে এটি ম্যাক ৩.২ গতি (২,০৭০ মাইল/ঘণ্টা বা ৩,৩৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টা) তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এ সময় বিমানটি ভূপৃষ্ট হতে ৮০,০০০ ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছিল।

এত কিছুর পরও কোন এক অজ্ঞাত কারণে এই বিমানটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীকে কমিশন দেয়া হয়নি। এই প্রোগ্রামটি বাতিল হয়ে যায়। যদিও ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বিমান বাহিনী ও নাসা’র গবেষণামূলকভাবে ওয়াইএফ-১২ কে বেশ কয়েক বার ব্যবহার করা হয়েছিল।

এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড (SR-71 Blackbird)

শত্রু দেশের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তাদের গোপনীয় স্থাপনা ও টেরেইন সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ১৯৬০ সালে লকহিড’র তত্ত্বাবধানে তৈরী হয়েছিল এসআর-৭১ ব্লাকবার্ড। এই প্রোগ্রামকে ডাকা হয় “ব্লাক প্রোগ্রাম”, যা অত্যন্ত গোপনীয় একটি প্রজেক্ট। ঐ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অত্যন্ত শীতল সম্পর্ক (কোল্ড ওয়ার) চলছিল।

এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড (SR-71 Blackbird)

গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার সময় দুই জন বৈমানিক চালিত এই দুই-ইঞ্জিনের গোয়েন্দা প্লেনটি গতি দিয়ে শত্রু বাহিনীর যে কোন বিমানকে পিছনে ফেলে দিতে পারত। এমনকি সারফেস-টু-এয়ার কোন মিসাইলও এর টিকিটি ছুঁতে পারত না।

৮০,০০০ ফুট উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় এই বিমানটির সর্বোচ্চ গতিবেগ রেকর্ড করা হয় ম্যাক ৩.৩ এরও বেশি (২,২০০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ৩,৫৪০ কিলোমিটার/ঘণ্টা)।

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে এসআর-৭১ খেকে প্রথমবারের মত আকাশে উড়ানো হয় এবং ১৯৬৪ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে বিভিন্ন সময়ে সার্ভিসে পাঠান হয়। ব্ল্যাকবার্ডের অতুলনীয় পারফরমেন্স ও বিপুল এ্যাচিভমেন্টের কারণে এটিকে শীতল-যুদ্ধ সমকালীন সময়ের সবচেয়ে সফল বিমান হিসাবে ধরা হয়। আর, এই বিমানের প্রাযুক্তিক সফলতা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশ বিদ্যায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করে।

এক্স-১৫ (X-15)

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী ও নাসা’র যৌথ উদ্যোগ তৈরী করা হয় এক্স-১৫। গবেষনা ও পরীক্ষামূলক কাছে এটি এক্স-প্লেন সিরিজের বিমানগুলো তৈরী ও আকাশে উড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়। এগুলোর বিশেষত্ব ছিল, এদের ইঞ্জিন ছিল রকেট-চালিত।

এক্স-১৫ (X-15)

১৯৬০ সালের প্রথম দিকে এই বিমানগুলোর আকাশে উড়বার সময় গতি ও উঁচুতে উঠবার রেকর্ড তৈরী করে। ১৯৬৩ সালে অন্তত দুইবার এটি পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব সীমার একেবারে শেষ প্রান্তে (৬২ মাইল বা ১০০ কিলোমিটারের বেশি) পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।

বর্তমানে, মনুষ্যবাহী বিমানের সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে চলার রেকর্ডটি ধরে রেখেছে এক্স-১৫ বিমানটি। এর সর্বোচ্চ গতি রেকর্ড করা হয়, ম্যাক ৬.৭২ (৪,৫২০ মাইল/ঘণ্টা, বা, ৭,২৭৪ কিলোমিটার/ঘণ্টা) অর্থাৎ এটি শব্দের চেয়ে ৬.৭২ গুণ বেশি জোরে ছুটতে পারত।

এক্স-১৫ কে ১৯৭০ সালে অবসরে দেয়া হয়, কিন্তু, এই প্রোগ্রামের মধ্যে দিয়ে নাসা এবং বিমান বাহিনীর বেশ কয়েক জন খ্যাতিমান বৈমানিকের খোঁজ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, নীল আর্মস্ট্রং (Neil Armstrong), যিনি পরবর্তীতে চাঁদের বুকে প্রথম পদার্পনের বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন।

এক্স-১৫ প্রোগ্রামের বেশ কিছু মজার ঘটনা ঘটে। এই জেট প্লেনের ১৩টি ফ্লাইট পরিচালনাকারী আট জন বিভিন্ন বৈমানিক যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর স্পেসফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ডের “৫০ মাইল (৮০ কিলোমিটার) উচ্চতা অতিক্রম না করা” সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ডকে ভেঙ্গে ফেলেন। তাদের এই সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এই বৈমানিকদের Air Force Astronaut Wings খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাদের মধ্যে নন-মিলিটারী বৈমানিকদেরকে নাসা’র তালিকাভূক্ত বৈমানিকদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে নেয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.