হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaইসলামহযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
Advertisements

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাবের পূর্বে দুনিয়ার অবস্থা ভাল ছিল না। মানুষ আল্লাহ তায়া’লার বিধান ও নবী-রাসূলগণের আদর্শ ভুলে সর্বপ্রকার অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল। তাদের আচার-আচরণ ছিল বর্বর ও মানবতাবিরোধী। এ কারণে এ যুগ ‘আইয়ামে জাহিলিয়া’ বা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ’ হিসেবে পরিচিতি। এ সময়ে মানুষের জান-মাল, ইজ্জত-আবরুর কোন নিরাপত্তা ছিল না। শান্তি-শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা বলতে কিছুই ছিল না। নরহত্যা, রাহাজানি, ডাকাতি, মারামারি, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া, জুয়াখেলা, মদ পান, সুদ, ব্যাভিচার, ইত্যাকার খারাপ কাজ ছিল তখনকার লোকদের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

আরবের লোকেরা শত শত দেবদেবীর মূর্তি বানিয়ে তার পূজা করত, তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করাই ছিল তাদের ধর্ম। কাবাঘরে তারা ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল। এককথায় পাপ-পঙ্কিলতার অতল তলে নিমজ্জিত ছিল তারা। মানবতার এ চরম দুর্দিনে আল্লাহ তায়া’লা তাঁর প্রিয়বন্ধ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, রাহমাতু্ললিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে পাঠালেন বিশ্বমানবতার শান্তিদূত হিসেবে।

মুহাম্মদ (সা.) এর শৈশব

আরবের কুরাইশ বংশে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জন্ম হলো। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ্‌ এবং মাতার নাম আমিনা। জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। শিশু মুহাম্মদ (সা.) এর চরিত্রে ইনসাফের একটি অনুপথ দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। তিনি ধাত্রীমাতা হালিমার একটি স্তন পান করতেন এবং অন্যটি তাঁর দুধ ভাই আবদুল্লাহর জন্য রেখে দিতেন। মাতৃস্নেহের পাঁচ বছর পর্যন্ত লালন-পালন করে হালিমা মুহাম্মদ (সা.) কে মা আমিনার কোলে ফিরিয়ে দিয়ে যান। ছয় বছর বয়সে তাঁর মা আমিনা ইন্তেকাল করেন। প্রিয়নবী তাঁর পিতামাতা উভয়কে হারিয়ে অসহায়-ইয়াতিম হয়ে পড়েন।

মহানবী (সা.) এর কৈশোর

মা আমিনা মারা যাওয়ার পর হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর দাদাদ আবদুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে লালিত-পালিত হতে থাকেন। কিন্তু আট বছর বয়সে তিনি দাদাকেও হারান। এরপর তিনি চাচা আবু তালিবের স্নেহে লালিত-পালিত হতে থাকেন। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন কর্মঠ। কারও গলগ্রহ হয়ে থাকা তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি আবু তালিবের অসচ্ছল সংসারে নানাভাবে সাহায্য করতেন। বাড়তি আয়ের জন্য তিনি মেষ চরান। মেষপালক রাখার বালকদের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ। তাদের সাথে তিনি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। চাচার সঙ্গে ব্যবসার উদ্দেশ্যে তিনি সিরিয়া যান। যাত্রাপথে বহিরা নামক পাদ্রির সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। বহিরা তাঁকে অসাধারণ বালক বলে উল্লেখ করেন। তিনি শেষ জামানার নবী হবেন বলে বহিরা ভবিষ্যদ্বানী করেন।

সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করে বালক মুহাম্মদ (সা.) প্রত্যক্ষ করলেন ফিজার যুদ্ধের বিভীষিকা। এ যুদ্ধ হয় নিষিদ্ধ মাসে। এ ছাড়া কাইস গোত্র অন্যায়ভাবে এ যুদ্ধ কুরাইশদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলে। এজন্য একে ‘হারবুল ফিজার’ বা ‘অন্যায় সময়ের যুদ্ধ’ বলা হয়। এ যুদ্ধ পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এ যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা.) নিজে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেননি, তবে তিনি যুদ্ধের বিভীষিকাময় করুণ দৃশ্য অবলোকন করেছিলেন। এতে তাঁর কোমল হৃদয় কেঁদে উঠে। আহতদের আর্তনাদে তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি শান্তির ধর্ম ইসলামের দিশারী হবেন। তাই এই অশান্তি তাঁর সহ্য হলো না। তাই তিনি শান্তিকামী উৎসাহী যুবকদের নিয়ে গঠন করলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ অর্থাৎ ‘শান্তিসংঘ’।

আর্তের সেবা করা, অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং গোত্রে গোত্রে শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখা ছিল এ শান্তিসংঘের উদ্দেশ্য। হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আচার ব্যবহার, আমানতদারি, সত্যবাদিতা প্রভৃতি চারিত্রিক গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে আরবরা তাঁকে উপাধি দেয় ‘আল আমিন’ বা ‘বিশ্বাসী’ বলে। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর যারা তাঁর ঘোর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল তারাও তাঁকে কখনও মিথ্যাবাদী, অবিশ্বাসী বলতে পারেনি।

যুবক মুহাম্মদ (সা.) এর সততা, সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক মাধুর্যের কথা শুনে মক্কার সম্পদশালী বিদুষী, বিধবা মহিলা খাদিজা নিজ ব্যবসায়ের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পন করেন। তিনি ব্যবসায়ের দায়িত্ব নিয়ে সিরিয়া গমন করেন িএবং ব্যবসায়ে আশাতীত সাফল্য অর্জন করন। খাদিজার ব্যবসা পরিচালনায় হযরত মুহাম্মদ (সা.) সততার যে নজির স্থাপন করেন, তা সর্বকালের যুবকদের জন্য আদর্শ। এ সফরে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর চরিত্র পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করার জন্য খাদিজা তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী মাইসারাকে তাঁর সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। মাইসারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সততা, বিশ্বস্ততা ও কর্মদক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, তাতে মুগ্ধ হয়ে খাদিজা নিজেই মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। চাচা আবু তালিবের সম্মতিক্রমে খিাদিজার সঙ্গে তাঁর বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। এ সময়ে তাঁর বয়স পঁচিশ বছর আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। বিবাহের পর খাদিজার সৌজন্যবোধ ও আন্তরিকতায় প্রচুর সম্পদের মালিক হন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। কিন্তু তিনি এ সম্পদ ভোগ-বিলাশ ও আরাম-আয়েসে ব্যয় না করে দুঃখী ও আর্ত-পীড়িতদের সেবার ব্যয় করেন।

নবুয়াত প্রাপ্তি

হযরত মুহাম্মদ (সা.) হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালীন একরাতে জিবরাঈল (আ.) তাঁর কাছে ওহি নিয়ে আসেন। তখন তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তিনি ধরে ফিরে খাদিজা (রা.) কে বললেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তিনি স্ত্রী খাদিজার নিকট সব ঘটনা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আমার জীবনের আশঙ্কা করছি।’ তখন খাদিজা (রা.) নবী (সা.) কে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘না, কখনও না। আল্লাহর কসম, তিনি কখনই আপনাকে অপদস্থ করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, দুস্থ-দূর্বলদের থাকা ও খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেন। নিঃস্ব ও অভাবীদের উপার্জনক্ষম করেন। মেহমানদের সেবা-যত্ন করেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে লোকদের সাহায্য করেন’।

ঈমানের দাওয়াত

মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক প্রথমে নিকট আত্মীয়-স্বজনের কাছে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিতে লাগলেন। নবী (সা.) গোপনে গোপনে ইসলামর দাওয়াত দিতেন। এরপর আল্লাহ তাঁকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দিলে তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। এতে মূর্তিপূজারী লোকজন তাঁর বিরোধিতা আরম্ভ করল। তাঁর ওপর নানারকম নির্যাতন চালাতে লাগল। তারা মহানবী (সা.) তে নেতৃত্ব ও ধন-সম্পদের প্রলোভন দেখাল। তিনি বললেন, ‘আমার এক হাতে সূর্য ও অন্য হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি সত্য প্রচার থেকে বিরত হবো না। মহানবী (সা.) এর এই উক্তি দ্বারা তাঁর সত্যনিষ্ঠা, অপূর্ব ত্যাগ, দৃঢ়তা ও সংযমের পরিচয় মূর্ত হয়ে ওঠে।

মি’রাজ

মক্কার কাফেরদের সীমাহীন অত্যাচার এবং তায়েফবাসীদের দূর্ব্যবহারে মহানবী (সা.) যখন নিদারুণ মর্মাহত, তখন আল্লাহ তায়া’লা তাঁকে, মি’রাজের সম্মান দান করেন। মি’রাজ অর্থ সিঁড়ি, সোপান, ঊর্ধ্বগমন। নবুয়াতের একাদশ সনে রজব মাসের ২৭ তারিখ আল্লাহ তায়া’লা মহানবী (সা.) কে সশরীরে অতি অল্প সময়ে মসজিদে হারাম থেকে বায়তুল মাকদাস এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ করিয়ে আনেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এই ভ্রমণকে মি’রাজ বলে। এ ভ্রমণে নবী (সা.) কে ‘বুরাক’ ও ‘রফরফ’ নামক দু’টি দ্রুতগামী বাহন বহন করে। বায়তুল মাকদাসে তিনি পূর্ববর্তী নবীগণের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁদের ইমাম হয়ে দু’রাকায়াত সালাত আদায় করেন। সেখান থেকে সাত আসমান অতিক্রম করে তিনি আল্লাহর দিদার বা সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ প্রাপ্ত হন। মি’রাজ মহানবী (সা.) এর জীবনের সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ ঘটনায় তিনি নতুন কর্ম প্রেরণায় উজ্জীবিত হন।

হিজরত

মক্কায় একসময় কুরাইশদের বিরোধিতা চরমে উঠল। তারা ইসলামের প্রচার ও প্রসার বাধাগ্রস্ত করল। তখন আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মক্কার কাফেররা যখন দেখল যে, আস্তে আস্তে মুসলমানরা মক্কা ছেড়ে হিজরত করে চলে যাচ্ছে, মক্কা প্রায় মুসলিমশূন্য হয়ে গিয়েছে, তখন তারা মনে করল, নবী মুহাম্মদ (ষা.) হয়রত এক ফাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন। তাই সকল গোত্র সম্মিলিতভাবে মহানবী (সা.) কে হত্যার সিদ্ধান্ত নিল। সে মোতাবেক তারা এক রাতে নবীর ঘর অবরোধ করল। প্রত্যুষে নবী (সা.) কে হত্যা করার অপেক্ষায় থাকল। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে মহানবী (সা.) তাদের চোখে ধূলি দিয়ে আবু বকর (রা.) কে সাথে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তাঁর কাছে গচ্ছিত সম্পদ বা আমানত প্রাপকদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্য মহানবী (সা.) হযরত আলী (রা.) কে তাঁর ঘরে রেখে যান। উল্লেখ্য, মক্কার লোকেরা তাঁর দ্বীন গ্রহণ না করলেও তাঁকে বিশ্বাস করত। তাই তারা তাঁকে আল আমিন বলে ডাকত। তারা অনেকেই নবী (সা.) এর কাছে তাঁদের সম্পদ রেখে নিরাপত্তাবোধ করত।

এদিকে অপেক্ষমাণ কাফেররা ঘরে ঢুকে নবী (সা.) এর বিছানায় আলী (রা.) কে দেখতে পেয়ে ক্রোধে ফেটে পড়ল। কিন্তু আলী (রা.) এখানে তাঁর থাকার কারণ খুলে বলায় তারা শান্ত হলো। তারা জানতে পারল, মহানবী (সা.) তাঁর কাছে রক্ষিত আমানত লোকদের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্যই আলী (রা.) কে তাঁর ঘরে রেখে গেছেন। এই কথা শুনে ও নবী (সা.) এর আমানতদারি দেখে তারা মনে মনে লজ্জিত হলো। যাকে হত্যা করার জন্য তাদের এই প্রচেষ্টায় সে এত মহৎ ও উদার হতে পারে, এ কথা তারা ভাবতেও পারেনি।

মহানবী (সা.) ও আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কিছুদূর অগ্রসর হয়ে মক্কার সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন। এদিকে কাফেররা তাঁদের খুঁজতে খুঁজতে একেবারে গুহার মুখে এসে পড়ল। আবু বকর (রা.) গুহার মুখে কাফেরদের গতিবিধি লক্ষ্য করে একটু বিচলিত হয়ে পড়লেন। নবী (সা.) বললেন, আবু বকর, চিন্তা করো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

আল্লাহর উপর মহানবী (সা.) এর ছিল গভীর আস্থা ও অটল বিশ্বাস। তিনি জীবনের সব কাজে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করতেন। তাই আল্লাহতায়ালা তাঁকে সকল বিপদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর হিজরত করে মদীনায় পৌঁছান। মদীনার আবাল-বৃদ্ধবনিতা পরম আগ্রহ ও ভালবাসায় মহানবী (সা.) কে গ্রহণ করল। মদীনার ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। মদীনায় এসে মহানবী (সা.) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন। আনসার তারা যারা মদীনার অধিবাসী এবং মুহাজির তারা যারা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। আনসারগণ মুহাজিরদের সকল ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। মুসলিক জাতি আজ যদি ভ্রাতৃঘাতী কার্যকলাপ পরিহার করে মদীনার আনসারগণের ন্যায় বিপন্ন মুসলিম ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে আসে, তা হলে আজও মুসলিম জাহান শান্তি ও সমৃদ্ধির নীড়ে পরিণত হতে পারে।

মদীনা সনদ

মহানবী (সা.) হিজরত করে মদীনাকে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। তিনি সেখানে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রী প্রতিষ্ঠা করেন। এর নিরাপত্তা ও হিজাযতের স্বার্থে কতগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তার মধ্যে মদীনার সনদ অন্যতম। মহানবী (সা.) মদীনার মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের লোকদের একত্রিত করে পরস্পরের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটি সনদ সম্পাদন করেন। ইতিহাসে একে মদীনার সনদ নামে অভিহিত করা হয়। মদীনায় নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের এ সনদই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত চুক্তি বা সংবিধান।

সনদের ধারাসমূহ

সনদে মোট ৪৭টি ধারা ছিল। নিম্নে সনদের প্রধান কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো:

১. সনদের স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহকে নিয়ে একটি সাধারণ জাতি গঠিত হবে।
২. সনদের স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহের কারও ওপর যদি বাইরের শত্রু আক্রমণ করে, তবে সকল সম্প্রদায় মিলে শত্রুকে প্রতিহত করবে।
৩. কেউ মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কুরাইশদের কোনরূপ সাহায্য সহযোগিতা করতে পারবে না। কিংবা তাদের সাথে কোনরূপ গোপন চুক্তিও করতে পারবে না।
৪. সকল সম্প্রদায় স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্ম পালনে বাঁধা সৃষ্টি করবে না।
৫. কেউ যদি কোনরূপ অপরাধ করে, তবে তার জন্য তাকেই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হবে। এজন্য তার সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা যাবে না।
৬. অসহায়, দুর্বল, অত্যাচারিতকে সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে।
৭. হত্যা, রক্তারক্তি, বলাৎকার ইত্যাদি কাজকর্ম এখন থেকে নিষিদ্ধ করা হলো।
৮. মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদীনা রাষ্ট্রের প্রধান হবেন এবং তিনিই পদাধিকার বলে প্রধান বিচারপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকবেন।

মদীনা সনদের গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাসে মদীনা সনদের গুরুত্ব অপরিসীম। এ সনদের কারণে মদীনাবাসীদের হিংসা, বিদ্বেষ ও কলহের অবসান হলো এবং তারা ঐক্যবদ্ধ হলো। মদীনার নিরাপত্তা ও নিজেদের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা সুদৃঢ় হলো। এ সনদের ফলে মুসলমান ও অমুসলমানের মধ্যে এক অপূর্ব সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠল। জানমালের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হলো। নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। মোটকথা, মদীনা সনদের দ্বারা একটি সুখ, শক্তিময় ও কল্যানকর আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হলো।

মক্কা বিজয়

মদীনায় হিজরতের ছয় বছর পর মহানবী (সা.) মক্কায় হজ করতে যেতে পারেননি। তাই ৬ষ্ঠ হিজরির জিলক্বদ মাসে ১৪০০ সাহাবীসহ মহানবী (সা.) উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলে কুরাইশরা বাধার সৃষ্টি করে। ফলে হুদায়বিয়ার সন্ধিছুক্তির মাধ্যমে মহানবী (সা.) হজ না করে মদীনায় ফিরে আসেন। হুদায়বিয়ায় সম্পাদিত চুক্তির ধারা অনুসারে আরবের বনু খুযাআ মহানবী (সা.) এর এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করে বনু বকর তাদের মিত্র কুরাইশদের যোগসাজশে একরাতে বনু খুযাআ গোত্রের ওপর আক্রমণ করে বসে। এতে বনু খুযাআর কয়েক ব্যক্তি নিহত ও অনেকে আহত হয়। খুযাআগণ মহানবী (সা.) কে ঘটনা জানিয়ে তাঁর সাহায্য কামনা করে। মহানবী (সা.) চুক্তির শর্তানুসারে তাদের সাহায্য না করে পারলেন না। তাই তিনি কুরাইশদের কাছে দূর মারফত জানালেন যে,

ক. তোমরা খুযাআ গোত্রকে ক্ষতিপূরণ দাও।
খ. অথবা, বনু বকর গোত্রের সাথে মিত্রা বিলোপ কর।
গ. অথবা, হুদায়বিয়া সম্পাদিত চুক্তি বাতিল বলে ঘোষণা কর।

কুরাইশরা হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল ঘোষণা করল। এরপর মহানবী (ষা.) অষ্টম হিজরি সনের রমযান মাসে দশ হাজার সাহাবী নিয়ে মক্কা বিজয়ের জন্য যাত্রা করেন। এত বড় সৈন্যবাহিনী দেখে মক্কার কুরাইশরা যুদ্ধ করতে আর সাহস পেল না। প্রায় বিনা বাঁধায় মহানবী (সা.) মক্কা জয় করেন। স্বীয় জীবন ও ইসলাম রক্ষার জন্য মহানবী (সা.) কে একদিন মক্কা ছেড়ে মদীনায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আর আজ তিনি বিজয়ী মহাবীরের বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তিনি বনে গেলেন মক্কার একচ্ছত্র অধিপতি।

বিদায় হজ্জ

ইসলামের দ্রুত প্রসার হওয়ায় এবং বিভিন্ন গোত্র থেকে মদীনায় দলে দলে লোক আসতে থাকায় মহানবী (সা.) বুঝতে পারলেন যে, তাঁর কর্তব্য শেষ হয়ে এসেছে। তাঁর জীবনকাল ফুরিয়ে এসেছ। তাই তিনি হিজরি দশম সনে হজ করার মনস্থ করলেন। মক্কা থেকে হিজরত করার পর তিনি কয়েকবার উমরাহ পালন করলেও হজ করার সুযোগ পাননি। সেদিক থেকে এটা ছিল তাঁর প্রথম হজ। অন্যদিকে মহানবী (সা.) পরবর্তী জীবনে আর হজ করার সুযোগ পাননি বলে এটা ছিল তাঁর জীবনের শেষ বা বিদায় হজ। মহানবী (সা.) সকলের মধ্যে হজে গমনর কথা ঘোষণা করলেন। দশম হিজরীতে তিনি মদীনা থেকে মক্কার পথে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ান হলেন। মহানবী (সা.) এর সকল বিবি তাঁর সাথী হলেন। কুরবানির জন্য একশত উট নেয়া হলো। লক্ষাধিক মুসলমান নিয়ে মহানবী (সা.) মক্কায় গমন করেন। যুল হুলাইফায় গিয়ে মহানবী (সা.) ও তাঁর সঙ্গীরা সকলে হজের জন্য ইহরাম বাঁধলেন।

মহানবী (সা.) মক্কা প্রবেশ করে সাতবার কাবাঘর তাওয়াফ করলেন, মাকামে ইব্রাহীমে সালাত আদায় করলেন এবং সাফা ও মারওয়া পর্বতের মাঝে সাতবার দৌঁড়ালেন। জিলহজ্ব মাসের অষ্টম তারিখে মিনায় গমন করলেন এবং নবম দিনে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করলেন।

বিদায় হজ্জের ভাষণ

আরাফাতে মহানবী (সা.) পাহাড়ের উচ্চস্থান জাবালে রহমতে দণ্ডায়মান হলেন। এখানে তিনি উপস্থিত লক্ষাধিক অনুসারী মুসলমানকে উদ্দেশ্য করে মর্মস্পর্শী এক ভাষণ দান করলেন। বিশ্ব ইতিহাসে এ ভাষণ মানবাধিকারের সনদ হিসাবে খ্যাত। কারণ, এই ভাষণে মহানবী (সা.) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অধিকারের শাশ্বত বাণী উল্লেখ করেছেন। নিম্নে বিদায়হজ্জের প্রদত্ত ভাষণের সংক্ষিপ্তসার উল্লেখ করা হলো:

ভাষণের প্রথমে মহানবী (সা.) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, এবং বললেন,

১. হে মানব সকল! আমার কথা মনোযোগের সাথে শুনে রেখ। কারণ, আগামী বছর আমি তোমাদের সাথে এখানে সমবেত হতে পারব কি না, আমি জানি না।

২. আজকের এ দিন, এ স্থান, এ মাস যেমন পবিত্র, তেমনই তোমাদের জীবন ও সম্পদ পরস্পরের নিকট পবিত্র।

৩. মনে রাখবে, অবশ্যই একদিন সকলকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেদিন সকলকে নিজ নিজ কাজের হিসাবে দিতে হবে।

৪. হে বিশ্বাসীগণ! স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহার করবে। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তেমনই তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার রয়েছে। তাদের তোমরা আল্লাহকে সাক্ষী রেখেই গ্রহণ করেছ।

৫. দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। তোমরা যা আহার করবে, পরিধান করবে, তাদেরও তাই আহার করাবে ও পরিধান করাবে। তারা যদি কোনো অমার্জনীয় অন্যায় করে ফেলে, তবে তাদের মুক্ত করে দেবে, তবুও তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। কেননা, তারা তোমাদের মতই মানুষ, আল্লাহর সৃষ্টি। সকল মুসলিম একে অন্যের ভাই তোমরা একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।

৬. জাহিলি যুগের সকল কুসংস্কার ও হত্যার প্রতিশোধ বাতিল করা হলো। তোমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহর বাণী এবং তাঁর রাসূলের আদর্শ রেখে যাচিছ। একে যতদিন তোমরা আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা বিপথগামী হবে না।

৭. আমিই শেষ নবী, আমার পর কোনো নবী আসবে না।

৮. তোমরা যারা উপস্থিত আছ, তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার কথা পৌঁছে দেবে।

এরপর মহানবী (সা.) আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘হে আল্লাহ! তোমার বাণীকে আমি কি যথাযথভাবে মানুষের নিকট পৌঁছাতে পেরেছি?’

উপস্থিত লক্ষ জনতা সমস্বরে জবাব দিলেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

নবীজী বললেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক’।

এরপর নাযিল হলো পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘আমি আজ তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমাদের জন্য একমাত্র জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩)

ইন্তেকাল

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের যিলহজ্ব মাসে বিদায় হজ সম্পন্ন করেন। ২৯ সফর আল্লাহর রাসূল (সা.) মাথা ব্যথা ও জ্বরে আক্রান্ত হন। ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি ইন্তেকাল করেন।

সূত্র: সেরা মানুষের জীবনকথা

পড়ার মত আরও আছে:
ক্যাটাগরিঃ ইসলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.