১৯টি প্রাকৃতিক বিস্ময় যেগুলো একবার হলেও দেখা উচিত

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaভ্রমণ১৯টি প্রাকৃতিক বিস্ময় যেগুলো একবার হলেও দেখা উচিত

সময়ের পরিক্রমায় এই পৃথিবীতে কত জনপদ ও তাদের কত বিচিত্র সৃষ্টি এক এক করে ধ্বংস হয়ে গেছে। মিসরের পিরামিডের কথা ধরা যাক। কত ঝড়-ঝঞ্জাকে উপেক্ষা করে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি ছাড়াও শত শত প্রাকৃতিক বিস্ময় মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবী তার বুকে ধারণ করে আছে। এই জায়গা বা স্থাপনাগুলোর প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা দেখে চোখ কপালে উঠে যায় আধুনিক বিজ্ঞানীদের।

পৃথিবীর ১৯টি প্রাকৃতিক বিস্ময়

গল্পচ্ছলে অনেকে বলেই ফেলেন, এই জায়গা বা ঐ জায়গা না দেখে আমার যেন মৃত্যু না হয়। এই লেখায় এমন ১৯টি প্রকৃতির বিস্ময় পাঠকদের জন্য সংকলিত করা হয়েছে।

দৈত্যাকার ক্রিস্টাল গুহা (The Giant Crystal Cave)

The Giant Crystal Cave
By Alexander Van Driessche (CC BY 3.0), via Wikimedia Commons

ভূগৌলিক অবস্থান: নাইকা খনি, চিহুয়াহুয়া, মেক্সিকো (Naica Mine, Chihuahua, Mexico)

মেক্সিকোর স্থানীয় ভাষায় বলা হয়, Cueva de los Cristales। বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ক্রিস্টাল গুহা’। এটিই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া একমাত্র প্রাকৃতিকভাবে তৈরী একক সর্ববৃহৎ ক্রিস্টাল। ক্রিস্টালটির চূড়াগুলোর কোন কোনটির উচ্চতা ১৫ মিটার বা ৪৫ ফুট, আর ওজনে ৫০,০০০ কেজিরও বেশি।

মাটির নীচের ম্যাগমা (গলিত লাভা) চেম্বার থেকে ৫ কিলোমিটার উঁচুতে একটি প্রাচীন খাঁচের উপরে অবস্থিত এই গুহাটি। আর এখানেই জিপসামের (সেলেনাইটের) গাঁথুনিতে বেড়ে উঠেছে এই সর্ববৃহৎ ক্রিস্টালটি।

গলিত লোহিত লাভার উপরে ফুটন্ত ভূগর্ভস্ত পানিতে সালফারের ঘনত্ব বেশি থাকে। এর মধ্যে অক্সিজেন মিশে সালফেট আয়ন তৈরী হয়। গত ৫ লাখ বছর ধরে এই আয়ন থেকে জিপসাম দানা বাঁধতে বাঁধতে ক্রিস্টালে পরিণত হয়েছে। আর, ক্রিস্টালগুলো আশেপাশে ছড়িয়ে না পড়ে গুহার মধ্যে উপরের দিকে বর্ধিত হয়েছে। দেখে অনেক গীর্জার মত মনে হতে পারে।

অতি ক্ষুদ্রাকৃতির জীবানু (Microbial life) যা বিজ্ঞানের নতুন একটি ধারা, এই ক্রিস্টালের ভিতরে খুঁজে পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, জীবানুগুলো জীবন ধারণের অনুপযোগী সালফার মিশ্রিত ফুটন্ত গরম পানিতে বহাল তরিয়তেই বেঁচে ছিলএবং পরে ৫০,০০০ বছর ধরে গুহার ক্রিস্টালের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে।

প্রাকৃতিক বিস্ময় এই গুহাতে টুরিস্টদেরকে প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই বোধগম্য কারণে বিশেষ ধরণের স্যুট পরিধান করতে হয়। গুহার মধ্যে মধ্যে কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উঠে যায়; আর বাতাসের আর্দ্রতা থাকে শতকরা ৯০-৯৯ ভাগ।

এই গুহাটি মাইনাররা ২০০০ সালে খুঁজে পান। কিন্তু, গুহার ভিতরে বিরাজমান অসম্ভব বৈরী আবহাওয়ার কারণে পারতপক্ষে কেউ ধারে-কাছে ভিড়তে চান না। অতি উৎসাহী কেউ কেউ গুহাতে ঢুকে ১০ মিনিটের মধ্যে বের হয়ে আসতে বাধ্য হন।


গ্রেট ব্লু হোল (Great Blue Hole)

The Great Blue Hole, Lighthouse Reef, Belize (17°19' N – 87°32' W).
The Great Blue Hole, Lighthouse Reef, Belize © Yann Arthus-Bertrand/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: লাইনহাউস রীফ, বেলিজ (Lighthouse Reef, Belize)

গ্রেট ব্লু হোল একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে্য মোহনীয়, অন্যদিকে ভীতিকরও। এটা বেলিজের মূল ভূমি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রকৃতির বিস্ময় এই প্রাকৃতিক গর্তটি একেবারে গোলাকার। এর গভীরতা ১২৪ মিটার (৩৯১ ফুট) এবং প্রস্থে ৩০০ মিটার (৯৪৫ ফুট)। ধারণা করা হয়, স্তরে স্তরে তৈরী হওয়া এই ব্লু হোলটি বর্তমান অবস্থায় পৌঁছাতে ১৫,০০০ বছরের মত লেগেছে।

জলামগ্ন এই গর্ভে জটিল গঠণের পুরোটাই মিশমিশে অন্ধকারাচ্ছন্ন। আর এর ভিতরে অসংখ্যা স্ট্যালাকটাইট (stalactites) গুলোর কারণে ধরেই নেয়া যায় যে, এগুলো তৈরী হয়েছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে। পূর্বে গ্লেসিয়াল যুগের (glacial age) সময়ে সমুদ্র পৃষ্ঠ বর্তমানের তুলনায় অনেক নীচে ছিল। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে এই গুহাটি সমুদ্রের নোনা পানিতে তলিয়ে গেলে এর লাইমস্টোন কেভের ছাদ ধ্বসে পরে।

Stalactite
Stalactite

গ্রেট ব্লু হোলকে সেরা স্কুবা ডাইভিং স্পটগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়। এর স্বচ্ছ পরিষ্কার জলসারিতে প্যারাটফিশ এবং রিফ হাঙ্গরসহ বিভিন্ন ধরণের মাছের বসবাস রয়েছে। এগুলো ছাড়াও এ বদ্ধ জলরাশি অন্যান্য ছোট মাছদেরও অভয়ারণ্য।


ফিংগালের গুহা (Fingal’s Cave)

UK, Scotland, Argyll and Bute, rock island Staffa with Fingals Cave
UK, Scotland, Argyll and Bute, rock island Staffa with Fingals Cave © Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: স্টাফা দ্বীপ, ইনার হেব্রিজেস, স্কটল্যান্ড (Staffa Island, Inner Hebrides, Scotland)

ষষ্ঠকোণ বিশিষ্ট ব্যাসাল্টের কলাম আকৃতির দেয়ালের জন্য সুপরিচিত এই বিখ্যাত ফিংগালস কেভ। সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রবেষ্টিত এই গুহাটি স্কটল্যান্ডের স্টাফা দ্বীপে অবস্থিত। এর মালিকানা রয়েছে স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল ট্রাস্টের হাতে।

গুহাটির অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি হল, অদ্ভূত আকৃতির এই গুহার ভিতরে অনবরত মনোমুগ্ধকর শব্দ তৈরী হয়। এর কারণে এর স্থানীয় নাম Uamh-Binn, বাংলায় অর্থ হল ‘সুরের গুহা’।

অন্যান্য অনন্য বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এই গুহার অদ্ভূত পিলারগুলোর বৈশিষ্ট্য হল, এগুলো উত্তপ্ত লাভা শীতল হয়ে এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। আজ থেকে ৬০ মিলিয়ন বছরে আগে একই ভাবে তৈরী হয়েছিল আয়ারল্যান্ডের Giants Causeway। মজার ব্যাপার হল, এই দু’টো সাইটই এক উপাদানে তৈরী একটি ব্রীজ দ্বারা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে আছে।

১৭৭২ সালে এই গুহাটি আবিষ্কৃত হয় এবং সমকালীণ স্থানীয় একটি জনপ্রিয় কবিতার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। ফলশ্রুতিতে এই গুহাটি অনেকের উৎসাহ ও ভাবালুতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

ফিংগালের গুহাটি সৌন্দর্য্য এতটাই নয়নাভিরাম যে, ইংরেজ রক সঙ্গীত শিল্পী পিংক ফ্লয়েডের গানের কলিতে এর উল্লেখ তার সুরের ছন্দে আজও ভেসে বেড়ায়। এমনকি এই গুহা ভ্রমণ করে গেছেন স্বয়ং যুক্তরাজ্যের রাণী ভিক্টোরিয়া।

স্টাফা দ্বীপে পৌঁছাতে হলে দুরন্ত সাগরের ঢেউ পেরিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপটি বসবাসের অনুপযোগী। শুধুমাত্র গুহাটি দেখার জন্য কালেভদ্রে পর্যটকদের আনাগোনা দেখা যায়।


সাহারার চোখ (The Eye of the Sahara)

The eye of the Sahara, Mauritania
Astronauts aboard the International Space Station capture the Richat structure © NASA/SPL/Barcroft Media via Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: সাহারা মরুভূমি, মৌরিতানিয়া (Sahara Desert, Mauritania)

নাসা’র প্রথম দিককার মহাকাশ মিশনের স্যাটেলাইন টেলিস্কোপ দিয়ে তোলা ছবি থেকে এই ল্যান্ডমার্কটি আবিষ্কৃত হয়। তত দিন পর্যন্ত এর অস্তিত্ব কারও চোখে ধরা পড়েনি। একেবারে গোলাকৃতির এই স্থাপনাটি ৪০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর সুবিশাল গোলাকার ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে যে রঙের তারতম্য দেখা যায়, তা বিভিন্ন ধরণের অধ:ক্ষেপ ও আগ্নেয়শিলার অস্তিত্ব জানান দেয়।

স্থানীয়ভাবে টিকে Richat Structure বলা হয়। এই স্থাপনার গভীরতা ও গোলাকার আকৃতির জন্য ধারণা করা হয়, বহু পূর্বে হয়ত কোন মহাজাগতিক উল্কা এখানে আছড়ে পড়েছিল।

ভূতত্ত্ববিদগণ এই স্থানে বিস্তর গবেষণা করে দেখেছেন যে, এখানে কোন মহাজাগতিক কোন উল্কা আছড়ে পড়েনি, বরং স্থাপনাটির উপরে আসলে একটি গম্বুজ ছিল, যা কালে কালে ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে এমন দশা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি ক্ষয়প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ।

তারা আরও ধারণা করছেন, এই স্থাপনার মাটির নীচে থাকা পানি কোন একসময় ভূঅভ্যন্তরের গলিত ও উত্তপ্ত লাভার সংস্পর্শে এসেছিল। ফলে গ্যাসের চাপের লাভ একসময় ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। সম্ভবত: এ কারণে এখানে ভূপৃষ্ঠে দেখা যায় প্রচুর কোয়ার্জের মত নুড়িপাথর।


হ্যাং সন ডুং গুহা (Hang Son Doong Cave)

Amazing Drone Video Of World’s Largest Cave | msnbc (MSNBC/YouTube)

ভৌগলিক অবস্থান: কুয়াং বিন প্রদেশ, ভিয়েননাম (Quang Binh Province, Vietnam)

২০০ মিটার গভীর, ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৫০ মিটার প্রশস্ত, হ্যাং সন ডুং বিশ্বের বৃহত্তম গুহা। ভুঅভ্যন্তরের একটি নদীর মাধ্যমে এই গুহাটি তৈরী হয়, যা বিভিন্ন প্যাসেজের মধ্যে দিয়ে এখনও প্রবহমান। ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০ লক্ষ বছর পূর্বে এই গুহার সৃষ্টি হয়েছিল।

গুহার ভিতরের দিকটা এতটাই বিশাল যে, এর একেকটি প্রকোষ্টে রয়েছে নিজস্ব আবহাওয়া। এর ভিতরে জমে থাকা ঘন কুয়াশা এবং গাঢ় মেঘের কারণে এর ছাদ পর্যন্ত প্রায়শ:ই ঢাকা পড়ে যায়। গুল্ম ও গাছ-গাছালির ঘন সমাবেশ এর জমিন ঢেকে রেখেছে, ঠিক যেন সবুজ কার্পেট।

এটা এমন একটা আবহ তৈরী করে, মনে হয় আমরা যেন বাহিরেই বেড়ে উঠা কোন বনের মধ্যে রয়েছি। এই গুহার ছাদ দিয়ে ঘন মেঘরাশি বেরিয়ে পড়ার ফলে এই গুহার কথা পৃথিবীর মানুষের নজরে চলে আসে।

১৯৯১ সালে স্থানীয়দের একজন পাহাড়ের খাড়া দেয়াল বেয়ে উপড়ে উঠে আসেন এবং আচমকা এই গুহাটি দেখতে পান। এই গুহার কোন একটি চেম্বার দিয়ে বেরিয়ে আসা সাদা মেঘ তার চোখে পড়ে।

তারপরে দীর্ঘদিন পর ২০০৯ সালে একদল ব্রিটিশ পরিব্রাজক এই গুহাতে অভিযান চালিয়ে গুহাটির অস্তিত্ব আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত করেন। পৃথিবীবাসী জানতে পারেন এই গুহার ভিতরের বিস্ময়কর আবহাওয়া ব্যবস্থা, এতে থাকা ৬০ মিটার উঁচু ক্যালসাইট ওয়ালের কথা। একে নামকরণ করা হয় The Great Wall of Vietnam।

এছাড়াও গুহার মধ্যে রয়েছে ৮০ মিটার লম্বা স্ট্যালাগমাইট এবং বেস বস সাইজের ‘কেভ পার্ল’ (cave pearl)। দীর্ঘদিন ধরে ক্যালসিয়াম সল্টের জলীয় দ্রবণ একটি কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র বস্তুর উপরে ফোটা ফোটা পড়ার ফলে এই পার্লটি তৈরী হয়েছে।

এই গুহার ভিতরের চেম্বারগুলো খুব দুর্গম হওয়াতে এর অনেকাংশ এখনো অনাবিষ্কৃত রয়েছে। এই গুহাভ্যন্তর এতটাই দুর্গম যে, বলা হয়ে থাকে, এই গুহাতে যত মানুষের পদচারণা হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষের পদচারণা চাঁদের বুকে রয়েছে।

অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষদের কাছে এই গুহাটি অদম্য কৌতুহলের স্থান। যে কারণে প্রতি বছর মাত্র ৫০০ জন সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে এই গুহায় প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়। মজার ব্যাপার হল, এই গুহায় প্রবেশের অপেক্ষমান তালিকায় আগামী দু’বছরের জন্য কোন খালি স্থান নাই।


[adinserter block=”1″]

দ্য ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালিজ (The McMurdo Dry Valleys)

দ্য ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালিজ (The McMurdo Dry Valleys)
McMurdo Dry Valleys © NASA/GSFC/METI/ERSDAC/JAROS, and U.S./Japan ASTER Science Team

ভৌগলিক অবস্থান: অ্যান্টার্কটিকা (Antarctica)

পৃথিবীতে সবচেয়ে শুষ্ক জায়গাটি কোথায়? নিশ্চয় উত্তরটি মরুভূমি হবে! চিলির আতাকামা মরুভূমিতে? কিন্তু প্রায় এক মিলিয়ন বছর বৃষ্টিপাত দেখা যায়নি এমন একটি অঞ্চল রয়েছে যা স্পষ্টতই আটকাামা মরুভূমির ১৫ মিমি বৃষ্টিপাতকে অতিক্রম করে, যা এ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো ভ্যালিকে এই গ্রহের সবচেয়ে শুষ্ক স্থানের তকমা পেতে সাহায্য করেছে।

৪,৮০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলে কোন ধরনের বৃষ্টিপাত হয় না। কোন তুষার নেই, নেই এক ফোঁটা পানি এবং এমনকি নেই কোন বরফও। কাটাবাতিক (Katabatic) বাতাসের কারণে এই এলাকাতে বৃষ্টিপাত হয় না।

এই বায়ুতে আর্দ্রতা ভালই থাকে, কিন্তু, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে এই বায়ুকে টেনে ভ্যালির বাহিরে নিয়ে চলে যায়, যা এই এলাকার আর্দ্রতাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নিয়ে চলে যা।

সম্প্রতি আলোক সংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়া এই এলাকায় থাকা পাথরের ভেতরে পাওয়া গেছে এবং বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘মঙ্গল গ্রহের সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এলাকার পরিবেশ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।


অ্যান্টেলোপ ক্যানিয়ন (Antelope Canyon)

অ্যান্টেলোপ ক্যানিয়ন Antelope Canyon, Arizona, USA
Light coming into Antelope Canyon, Page, Arizona, USA © Ben Pipe Photography/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র (Arizona, USA)

অ্যান্টেলোপ ক্যানিয়ন আসলে একটি স্লট ক্যানিয়ন, যার প্রশস্ততার চাইতে চেয়ে গভীরতা বেশি, যা পানির অনবরত ঘর্ষণের মাধ্যমে গঠিত হয়।

স্থানীয় নাভাজোর’র বাসিন্দাগণ একে যেভাবে বলেন তা হল, ‘যেখানে পাথরের ভিতর দিয়ে পানি চলে যায় এটা সেই জায়গা’। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের সময় এলাকাটিতে নিয়মিতভাবে বন্যা হয়ে থাকে।

স্যান্ডস্টোন দিয়ে তৈরী এই ক্যানিয়নের দেয়ালে যে মসৃন ঢেউয়ের আকৃতির সৃষ্টি হয়েছে, তা পানির অববরত ঢেউ আছড়ে পড়ার কারণে তৈরী হয়েছে। এর কমলা রঙের দেয়ালে সূর্যের আলো ঠিকরে পরে ক্যানিয়নের মধ্যে অবিরত আলো-আধারির ছায়ার একটি আবহ তৈরী করে রাখে।

এই ভূতাত্ত্বিক আশ্চর্যের মহিমার মধ্যেও পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বিপজ্জনক পরিবেশের ছদ্মবেশ। কেননা এই ক্যানিয়ন বেসিনের ১১ কিলোমিটার দূরত্ব থেকে হঠাৎ করে ধেয়ে আসা জলোচ্ছাসে সৃষ্টি হয় আকস্মাৎ বন্যায়। আর এতে অপ্রস্তুত অবস্থায় পর্যটকদের বিপদে ফেলে দেয়।


চকোলেট হিলস (Chocolate Hills)

চকোলেট হিলস Chocolate Hills, Bohol, Philippines
Philippines, Chocolate Hills at sunrise © Per-Andre Hoffmann/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: বোহোল, ফিলিপাইনস (Bohol, Philippines)

ফিলিপাইনের স্থানীয়দের এই হিলগুলো নিয়ে কিছু অদ্ভূত কাহিনী প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এই এলাকায় একজন বিশালাকৃতির দৈত্য ছিল। তার প্রেয়সীর মৃত্যুর পর দৈত্যের চোখের অশ্রু থেকে এই হিলগুলো তৈরী হয়েছিল।

কেউ আবার বিশ্বাস করে, দৈত্য একটা নয়, ছিল দুইটা। তারা একসময় মারামারিতে জড়িয়ে গেল পরে তাদের মধ্যে আবার ভাব হয়ে যায়। দৈত্যদের একজন খাদ্যে বিষক্রিয়া মারা গেলে তাদের দেহ পঁচে দিয়ে এই চকোলেট হিলগুলো তৈরী হয়েছিল। এ রকমই অনেক রকম কেচ্ছা চালু আছে।

বোহোল প্রদেশের ৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে প্রায় ১,৭৭৬ টি পাহাড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পাহাড়গুলি চুনাপাথর দিয়ে তৈরি। এর উপরিভাগে জন্মেছে গাঢ় ঘাসের স্তর, যা শুষ্ক ঋতুতে চকোলেটের মত বাদামী রং ধারণ করে।

এই হিলগুলোতে থাকা চুনাপাথরে অনেক জলজ প্রাণীর ফসিল দেখতে পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কোরাল ও অ্যালগি, যেগুলো টেকটোনিক প্রভাবে সাগরের তলদেশ থেকে এই অঞ্চলে উঠে এসেছিল।

এই উঠে আসা উঁচু সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশ পরবর্তীতে নদীর পানির স্রোতের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পিছনে রেখে যায় এই রকম একই চেহারার হিলগুলোকে।


মিটিওর ক্রেটার (Meteor Crater)

মিটিওর ক্রেটার Meteor Crater West Winslow, Arizona, North America
Aerial view of Meteor Crater, near Winslow in northeast Arizona, USA © David Parker/Science Photo Library/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: ওয়েস্ট উইনস্লো, অ্যারিজোনা, নর্থ আমেরিকা (West Winslow, Arizona, North America)

প্রায় ১২০০ মিটার প্রশস্ত ও জায়গায়-জায়গায় ১৭০ মিটার গভীরতার অ্যারিজোনা ক্রেটারকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরভাবে সংরক্ষিত ক্রেটার। ধারণা করা হয়, এটি প্রায় ৫০,০০০ বছরের পুরনো। তার মানে হল, এই এলাকায় তখন বসবাসকারী ঘন-পশমের বিশালাকায় ম্যামথদের চোখের সামনে এই ক্রেটারটি তৈরী হয়েছিল। অ্যারিজোনার শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক ক্ষয়িষ্ণুতার প্রভাবকে অনেকাংশে দমিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে এই ক্রেটারকে। ফলে কালের বিবর্তনে এই ক্রেটারের গাঠনিক বিকৃতি থেকে রক্ষা পেয়েছে।

অ্যারিজোনার এই ক্রেটার তৈরীর কারণ হিসাবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিকেল ও লোহার দিয়ে তৈরী প্রায় ৫০ মিটার ব্যসের একটি উল্কা এখানে আছড়ে পড়ায় এই ক্রেটারটি তৈরী হয়েছে। অবশ্যই উল্কাটি পৃথিবী প্রবেশের সময় বায়ুমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষে জ্বলে যায়, বাকিটা মাটির সংঘর্ষে অজস্র টুকরার আকারে ক্রেটারের আশে-পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।

১৯৬০ সালের দিকে এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, যখন এই সাইটে একটি বিশেষ ধরণের সিলিকা বা বালুর উপস্থিতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। কারণ, এই ধরনের সিলিকা আগ্নেয়গিরি হতে উৎপন্ন হতে পারে না। এ ধরনের সিলিকা কেবলমাত্র উচ্চ তাপ ও উচ্চ চাপের যুগপৎ ঘটনার মাধ্যমেই তৈরী হতে পারে, যা উল্কাপিণ্ডের পতনের সময়ই কেবলমাত্র ঘটতে পারে।


পামুক্কেল ট্রাভারটাইন টেরেস (Pamukkale Travertine Terraces)

Pamukkale travertine terraces, Turkey
Layers of limestone and travertine, hot springs of Pamukkale (UNESCO World Heritage List, 1988) © De Agostini Picture Library/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: ডেনিজিলি, তুরস্ক (Denizili, Turkey)

পামুককেল শব্দটিকে তুর্কি ভাষায় “Cotton Castle” বা “তুলার দুর্গ” হিসাবে অনুবাদ করা হয়। এটা দেখে কল্পনাও করা যায় না কেন, কিভাবে, কখন এটি তুলা বা তুষার-প্রাচীরের হ্রদের মত হয়ে গিয়েছিল। অপূর্ব সুন্দর এই সাইটটি তাই প্রাচীন রোমান সময় থেকে প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসাবে সমাদৃত হয়ে আসছে।

নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্যমণ্ডিত এই স্থানের পুলগুলোতে কালে কালে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট জমে জমে তৈরী হয়েছে একের পর এক ধাপগুলো। উপরের দিকে প্রস্রবন থেকে গরম পানির ধারা অবিরত প্রবাহিত হচ্ছে। এই পানিতে থাকা মিহি মিনারেলগুলো ক্রিস্টালে পরিণত হয়ে এই রকম তুলার মত মোহনীয় চেহারা পেয়েছে। এই গরম পানি থেকে তৈরী হয়েছে নীল রঙের ঝর্ণা। পানির তাপমাত্রা কমবেশী ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আটকে থাকাতে তা বেশ আরামদায়ক মনে হয়। আর সেই এই এলাকার আশেপাশের মোহনীয় সৌন্দর্য্য একেবারে যেন সোনায় সোহাগা।

এই অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লোভে এই এলাকাটি সারা বছরই অসংখ্য পর্যটককে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।


ডানাকিল ডিপ্রেশন (Danakil Depression)

Danakil depression, Afar triangle, Ethiopia
The colourful springs of acid in Dallol, Danakil depression, Ethiopia © Michael Runkel/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: আফার ট্রায়াঙ্গল, ইথিওপিয়া (Afar Triangle, Ethiopia)

এই এলাকাটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে গরম এলাকা বলে বিবেচনা করা হয়। তার উপর আবার বৃষ্টিপাত হয় না একেবারেই। নদী শুকিয়ে লবনাক্ত লেকে পরিণত হয়ে গেছে, পানি গিয়ে ভারত সাগরে গিয়ে পড়া তো দূরে থাক। হাজার হাজার বছর আগে, এই শুকিয়ে যাওয়া অংশটি ছিল লোহিত সাগরের অংশ।

কিন্তু, আগ্নেয়গিরির উদগীরনের ফলে আশে-পাশের এলাকা উঁচু হয়ে যায় প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত। যার ফলে সাগরের সাথে ডানাকিল এলাকার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর এতেই শুকিয়ে যায় নদীর এই অংশটি।

বিচ্ছিন্ন এই প্রান্তরে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক মজার ঘটনাবহুল বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সালফারের গরম ঝর্ণা; ঠিক একেবারে পামুক্কেলের মত। যদিও এর চেহারা অতটা আকর্ষনীয় নয়, তারপরও মনকে আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট উপাদান এখানে রয়েছে; বিশেষ করে ফুটন্ত এসিড পানি, সবুজ ও হলুদ রঙের চিমনী আকৃতির মিনারেলের তৈরী ভূপৃষ্ঠ। আশ-পাশ দেখে মনে হবে, এ কোন এলিয়েনের রাজ্যে এসে পরলাম রে বাবা!

এই এলাকার এ সব বৈশিষ্ট্য মহাকাশ-জীববিজ্ঞানীদের বারবার আকর্ষণ করেছে; রহস্য উদঘাটনের জন্য তারা এখানে ছুটে এসেছেন গবেষণা করতে এই আশায় যে, অন্য গ্রহেও হয়ত এমন বিরূপ পরিবেশে জীবনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সালফার-সমৃদ্ধ এই তীব্র এসিডিক পানিতে দিব্যি বেঁচে আছে কঠিন-প্রাণ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোবসগুলো।

এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর এমন এক্সট্রিম আবহে বেঁচে থাকার ক্ষমতা দেখে বিজ্ঞানীদের ধারণা করছেন যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্য গ্রহের চরম বিরূপ আবহাওয়াতেও হয়ত প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে।


সালার দ্য ইউনি (Salar de Uyuni)

ভৌগলিক অবস্থান: পটসি, বলিভিয়া (Potosi, Bolivia)

কিংবদন্তীতে আছে, পাহাড়ের দৈত্য টুনাপাকে ছেড়ে দিয়ে তার পত্নী আরেকজন পাহাড়ের দৈত্যের সাথে ঘর বাঁধতে চলে যায়। মনের দু:খে টুনাপা যখন তার দুগ্ধপোষ্যকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন, তখন কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানির দুধের সাথে মিশে যায়; পরবর্তীতে তা শুকিয়ে গিয়ে বলিভিয়ার এই লবণাক্ত জলাধারের সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু, এই জলাধারের সৃষ্টির সাথে এই কিংবদন্তীতুল্য কাহিনীর কোন সংস্পর্শ নাই। এটি সৃষ্টি হয়েছিল আন্দেজ পর্বতমালার ভূমি উপরের দিকে উঠে যাওয়া থেকে। এই উপত্যকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৬৫৬ মিটার উঁচুতে। পানি উঁচু পাহাড়ের ধারে এসে কোথা দিয়ে বেরুবার পথ না পেয়ে এখানেই থমতে দাড়ায়।

এই এলাকাটা বিশাল। প্রাগৈতিহাসিক এই লেকে প্রায় ১০,০০০ হাজার বছর ধরে লবণের স্তর জমে জমে শক্ত হয়ে গিয়েছে। জলাধারটি বেশ কয়েক মিটার গভীর। এর মাঝে দিয়ে ঢালাও রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে পর্যটক, গাড়ি এবং পশুপাখি।

এই জলাধারের উপরের স্তরটি খুবই মসৃন এবং এর আলো প্রতিফলন ক্ষমতা খুব বেশি হওয়ার মহাকাশে চলমান স্যাটেলাইটগুলো এই চকচকে উপরিভাগে সিগন্যাল পাঠিয়ে ভূপৃষ্ঠ হতে উচ্চতা মাপার যন্ত্রের (altitude meter) ক্যালিব্রেশন ঠিক করে নেন!

এই উচ্চমাত্রার লবণাক্ত জলাধারের সঞ্চিত আছে লিথিয়াম। পৃথিবীর সমুদয় লিথিয়ামের ৫০-৭০ শতাংশই এখানে সঞ্চিত আছে। প্রতি বছর এই জলাধার থেকে প্রচুর লিথিয়াম সংগ্রহ করা হয়।


অ্যাকতুন টিউনিচিল মুকনাল (Actun Tunichil Muknal)

অ্যাকতুন টিউনিচিল মুকনাল (Actun Tunichil Muknal)
The Crystal Maiden (CC BY-SA 3.0)

ভৌগলিক অবস্থান: কায়ো ডিস্ট্রিক্ট, বেলাইজ (Cayo District, Belize)

প্রাচীন মায়ান সভ্যতার এই প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়ে ভরপুর এই গুহার ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে হয়তো অ্যাডভেঞ্চার সিনেমার নায়ক ইন্ডিয়ানা জোন্স’র মত ভাবতে শুরু করতে পারেন আপনি। স্থানীয় ভাষা থেকে অনুবাদ করলে নামটি দাঁড়ায়, ‘স্ফটিক সেপালচারের গুহা’ (the Cave of Crystal Sepulchre)। যেমন নাম, তেমনি তার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে এই গুহায়।

এই গুহার আরেক নাম হল, ‘স্ফটিক মানবী’। এই নামকরণের কারণ হল, এই গুহা শুয়ে আছে আনুমানিক ১৮ বছরের বয়সী একজন তরুণীর মমির দেহাবশেষ। এর আশেপাশে রয়েছে আরও কয়েকটি মমি। ধারণা করা হয়, এই হতভাগ্যদের বলি দেয়া হয়েছিল।

গুহার স্যাঁতস্যাতে মাটিতে মেয়েটির দেহাবশেষ হাড়ের উপরে ক্যালসিয়ামের আস্তর পরে স্ফটিক হয়ে ঢেকে যায়, যার উপরে আলোকে পড়লে আলো বিচ্ছুরণ হতে থাকে।

গুহার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কারণে গুহার ভিতরে বাঁকের সৃষ্টি হয়েছে, যার উপরের দিকে সৃষ্ট গর্ত দিয়ে এর ভিতরে প্রবেশ করা যায়। গুহার ভিতরে মায়ানদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিষপত্র দেখতে পাওয়া যায়।

এছাড়াও গুহার উপরের দিকে ভিতরের ছাদ দিয়ে চুঁইয়ে পড়া পানির খনিজ থেকে তৈরী হয়েছে স্ট্যালাকটাইট। আর, ছাদের চুঁইয়ের পানির নীচে ফোটায় ফোটায় পড়ে গুহার মেঝেতে তৈরী হয়েছে স্ট্যালাগমাইট।


সকোত্রা দ্বীপ (Socotra Island)

Socotra Iisland, Arabian Sea, Yemen
Dragon’s Blood trees, Socotra, Yemen © Tony Waltham/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: আরব সাগর, ইয়েমেন (Arabian Sea, Yemen)

একেবারেই নিভৃতে পড়ে থাকা এই সকোত্রা দ্বীপকে বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সবচেয়ে বিচিত্র জায়গা। এই স্থানটি একসময় গোন্ডয়ানা সুপার-কন্টিনেন্টের অংশ ছিল। ৫০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের বিচ্যুতির ফলে অন্যান্য স্থানের মতই এই স্থানটি একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই দ্বীপের রয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা গাছগাছালি এবং বিচিত্র জীব-জন্তুর বসবাস।

এই দ্বীপের বিচিত্র ফিচারের মধ্যে রয়েছে পাহাড়, যার উপরিভাগে রয়েছে চুনাপাথরের গুহা; আর আছে মরুভূমির মত জলবায়ু। এর দূর্গম এলাকার প্রচণ্ড তাপমাত্রা, অনবরত মরুময়তার কারণে এই দ্বীপের অর্গানিজমগুলো পরিবর্তিত হয়েছে, সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এর গাছ-গাছালিগুলো। এই বিচিত্র অঞ্চলের ৩৭% শতাংশ বা তারও বেশি পরিমাণ গাছ-গাছালির পৃথিবীর আর অন্য কোথাও দেখা যায় না। আরব সাগরের জলরাশি বেষ্টিত এই বিচিত্র স্থলভূমি যেন বিচিত্র প্রকৃতির এক অপার ভাণ্ডার।


কারলু কারলু (Karlu Karlu)

Karlu Karlu, Northern territory, Australia
Devil’s Marbles near Tennant Creek, Devil’s Marbles Conservation Reserve, Australia © Krzysztof Dydynski/Lonely Planet Images/Getty Images

ভৌগলিক স্থান: নর্দার্ন টেরিটোরি, অস্ট্রেলিয়া (Northern Territory, Australia)

টেনান্ট ক্রিকের একটি পাহাড়ি পথ আপনাকে নিয়ে যাবে পবিত্র ভূমি ‘ডেভিলস মার্বেলেস’, যেখানে অতিকায় পাথরের টুকরাগুলো একে অপরের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের টুকরোগুলো দেখে মনে হবে, কে যেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল যন্ত্রপাতি দিয়ে সুন্দর করে এদের বানিয়ে রেখেছে।

এই অতিকার পাথরগুলো গ্রানাইটে তৈরী। এগুলো তৈরী হয়েছিল যে উৎস থেকে তা এখন ভূগর্ভের নিচে দেবে গেছে। আজ থেকে ১.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে এই গ্রানাইট নুড়িপাথরের একটি স্তরে নিচে চাপা পড়ে ছিল। ক্রমান্বয়ে এগুলো মাটির সাথে মিশে গেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে গ্রানাইটের গায়ে অনেক চিড় সৃষ্টি হয়।

এক সময় এই চিড়গুলো ভিতরে পানি ঢুকে পড়ে। পরবর্তীতে পাথরগুলো বিরূপ আবহাওয়ার সম্মুখীন হয়। একের পর এক পানির ধারা ও পানির এসিডিক মলিকিউলের সংস্পর্শে এসে পাথরগুলো ক্রমান্বয়ে এ রকম স্ফীতাকার আকার ধারণ করে।

এই স্থানটি স্থানীয় আদিবাসীদের অথীব ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ স্থান। ২০০৮ সালের তাদের এই স্থানটি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। আদিবাসীদের নিকট একই স্থানটি ‘কারলু কারলু’ নামে সুপরিচিত।


মিংশা শান (Mingsha Shan)

Mngsha Shan, Dunhuang, China
Singing sand dunes near Dunhuang, China © Bob Krist/Corbis Documentary/Getty Images

ভোগলিক অবস্থান: ডুংহুয়ান, চীন (Dunhuang, China)

একটি বিবর্ণ ও বিভীষিকাময় বিরান ভূমিতে, যেখানে একজন পর্যটক হয়ত কোন ফিসফিস শব্দ বা মরুভূমির বালুর নিচে ক্রোধে উন্মত্ত কোন ড্রাগনের হাতে চাপা পড়ে থাকা আত্মার ভয়ার্ত চিৎকার শুনে হতকচিত হয়ে যাবেন – এমন ভয়ার্ত, অপার্থিক শব্দ যেখানে নিয়মিত শুনতে পাবেন, সেটি হল চীনের মিংশা মরুভূমিতে। চীনের এই অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে ৩৫টি মরুময় এলাকা।

নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মরুভূমিতে এমন গান শুনতে পাওয়া যেতে পারে; তা হল, বালুর কণাগুলো ০.১ থেকে ০.৫ মিলিমিটার ব্যাসের হতে হবে, বালুতে সিলিকা থাকতে হবে এবং বাতাসে থাকতে হবে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার জলীয় বাস্প। মরুভূমির ক্রিসেন্ট আকৃতির বালুর ঢিবির উপর দিয়ে কেউ হেটে যাওয়ার সময় বা বাতাস উড়ে যাওয়ার সময় এমন শব্দের সৃষ্টি হয়। একে বলা হয়, বারচান (barchan)।

এই মরুভূমিতে অদ্ভূত শব্দ সৃষ্টির ব্যাপারটা এখন সবার জানা। মরুভূমির উপরে অপেক্ষাকৃত ভেজা বালুর উপর দিয়ে গরম জোরালো বাতাস প্রবাহিত হলে বিভিন্ন কম্পাঙ্কের শব্দের অনুরণন থেকে এমন অদ্ভূত ‘শব্দ’ সৃষ্টি হয়। শব্দটা শুনে মনে হতে পারে মরুভূমিতে বালুর ‘হিমবাহ’ নেমে আসছে।

মাঝে মাঝে এই শব্দের তীব্র বেড়ে যায়; ১০৫ ডেসিবেল উচ্চে উঠে যায়। স্টেডিয়াম ভর্তি তুমুল উত্তেজনাকর খেলা দেখে দর্শরা যেরূপ শব্দ করে, ঠিক তেমন। মজার ব্যাপার হল, এই উচ্চাঙ্গের শব্দ নহর যেমন কয়েক মিনিট ধরে স্থানীয় হয়, আবার তেমনি এমন ঝপ করে বন্ধ হয়ে যায় যে, তখন নার্ভের উপর চাপ তৈরী করে।


অলিম্পিক ড্যাম (Olympic Dam)

Olympic dam, Gawler range, South Australia
Gawler Range, Australia © John Borthwick/Lonely Planet Images/Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: গাওলার রেঞ্জ, সাউথ অস্ট্রেলিয়া (Gawler Range, South Australia)

এখন যে সাইটটি নিয়ে বলব, সেখানে এক সময় একটি সুপার-সাইজের আগ্নেয়গিরি ছিল। এটি শেষ যেবার আগ্নেয়উৎপাত করেছিল, সেটিও প্রায় ১,৬০০ মিলিয়ন বছর আগে। বর্তমান এই স্থান থেকে ইউরেনিয়ম আহরণ করা হয়।

এ আগ্নেয়গিরির কেন্দ্র বিদীর্ণ হয়ে যে লাভার ছড়িয়ে পড়েছিল, তা ক্রমান্বয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আসে। লাভা ক্রমান্বয়ে ঠাণ্ডা হয়ে ষষ্ঠকোণী পাথুরে কলামের মত আকৃতি ধারণ করেছে। ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসের এই আগ্নেয়গিরি থেকে যে বিপূল পরিমাণ লাভা বের হয়েছিল তা থেকে প্রায় ৫ লক্ষ কিউবিক কিলোমিটার সমতল ভূমির সৃষ্টি হয়।

এই সাইটে যে বিপুল পরিমাণ জীবাস্ম আকরিক রয়েছে, তা এখন মাইনিং ইন্ডাস্ট্রির চারণভূমি। আকরিকের পাশাপাশি এখান থেকে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম, কপার, সিলভার এবং সোনা উত্তোলন করা হয়। পৃথিবীবাসী ঐ আগ্নেয়গিরি অতিকার লাভা উৎগীরনকে ধন্যবাদ জানায়; কেননা, এই সাইট থেকে বর্তমানে নয় বিলিয়ন টন আকরিক উত্তোলন করা হয়। এ কারণে এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আকরিক্ত উত্তোলনকারী সাইট হিসাব গণ্য করা হয়।


ইগুয়াজু জলপ্রপাত (Iguazu Falls)

Iguazu falls, Argentina-Brazil border
The Devil’s Throat © Getty Images

ভৌগলিক অবস্থান: আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সীমান্ত (Argentina-Brazil Border)

ব্রাজিলের বুকে সর্পিলাকারে প্রবাহিত হয়ে যে স্থানে খাঁড়া নিচের দিকে পড়েছে, সেটাই ইগুয়াজু জলপ্রপাত। আকারের দিক থেকে ইগুয়াজু পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত। এই জলপ্রপাত একা নয়, এখানে রয়েছে অনেকগুলো জলপ্রপাত। প্রতিটি আবার পাথর দ্বারা বিভক্ত হয়েছে। ঋতু ভেদে এবং পানির লেভেন অনুসারে এর সংখ্যা প্রায় ১৫০-৩০০ পর্যন্ত হয় যেগুলো উচ্চতায় ৬০ থেকে ৮২ মিটার হয়ে থাকে। এই জলপ্রপাতগুলোর অর্ধেকের বেশি থেকে প্রবাহিত পানি এসে এক জায়গায় গিয়ে মিলিত হয়েছে। স্থানীয় ভাষায় একে বলে ‘শয়তানের গলা’ (Garganta del Diablo)।

এই অনিন্দ্যসুন্দর সাইটটি আজ থেকে প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন বছর আগে তৈরী হয়েছিল যখন আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত লাভা এই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এখানে থাকা নুড়ি পাথরের সাথে লাভার সংমিশ্রন ক্রমান্বয়ে ঠাণ্ডা হয়ে এই জলপ্রপাতের ভিত্তি তৈরী হয়। ২০,০০০ বছর আগে এর সাথে যুক্ত হয় পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া। প্লেটের ভাঙ্গাগড়ায় যে পথ থরে ফল্ট ও ক্র্যাক তৈরী হয়, নদীর গতিপথও ঐ ধারা অনুসরণ করে অবশেষে ইগুয়াজু জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে।

ইগুয়াজু জলপ্রপাতটি ঢালের দিকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার আগে ছিল। নদীর পানির শক্তিশালী স্রোত ও পতনে জলপ্রপাতটি ক্ষয় হয়ে বর্তমান অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।


ইয়েলোস্টোন ফিউমারোলস (Yellowstone Fumaroles)

Yellowstone Fumaroles, National park, Wyoming, North America
Morning Glory Pool, Yellowstone NP in Upper Geyser Basin, Yellowstone National Park

ভৌগলিক অবস্থান: ইয়েলোস্টোন জাতীয় পার্ক, ওয়ামিং, নর্থ আমেরিকা (Yellowstone National Park, Wyoming, North America)

নর্থ আমেরিকা ওয়ামিং এলাকায় অবস্থিত ইয়েলোস্টোন জাতীয় পার্কে রয়েছে এই ফিউমারোলস। ফিউমারোলস এমন একটি হাইড্রোথারমাল (hydrothermal) স্ট্রাকচার যেখানে ভূগর্ভস্থ জীবিত আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার সংস্পর্শে এসে ফুটন্ত পানি উথলে উথলে উপরের দিকে উঠতে থাকে। এই পানি এতটাই গরম যে, পানির মাত্রার ১৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হতে দেখা গেছে। এই ফিউমারোলগুলো এলাকার ছোট পাহাড় ও পাহাড়ের খাঁচে অবস্থিত। এগুলো ভূমির সমতল হতে বেশ উঁচুতে হওয়াতে ফিউমারোলগুলো শীতল হওয়ার সুযোগ পায় যাতে পানিগুলো অনবরত বাস্পে পরিণত হতে পারে না।

এগুলো হতে গরম বাস্পের পাশাপাশি বিষাক্ত গ্যাসও বের হয়। বিষাক্ত গ্যাসের বেশির ভাগ সালফার জাতীয় গ্যাস যার সংস্পর্শে পথচারীদের নি:শব্দ মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এ জন্য পর্যটকদের এই অঞ্চলে খুব স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করতে পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে।

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে এই রকম প্রায় চার হাজারের মত ফিউমারোল রয়েছে। এদের সবগুলোরই উন্মুক্ত মুখের চতুর্দিকে বর্ণিল মিনারেলের আস্তর দেখা যায়। এই ফিউমোরোলসগুলো মাঝে মাঝে খুব বেশি মাত্রায় গরম পানি ও বিষাক্ত গ্যাস উগড়ে দিতে থাকে। এতে পার্কে থাকা অন্যান্য জীবজন্তুর প্রাণনাশের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। দেখা গেছে ভূমিকম্পের আগে আগে ফিউমোরোলগুলো এমন আচরণ করে থাকে।

ইয়োলোস্টোনের এমন ফিউমোরোলসের মত গঠনপ্রকৃতি দেখা গেছে লাল গ্রহ মঙ্গল এ। তবে, সেগুলো মৃত। তাই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মঙ্গলেও হয়ত কোন এক সময়ে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ছিল, ছিল এমন ফিউমোরোলস। আর, মঙ্গলের থাকা এই ফিউমোরোলসে হয়তো লুকিয়ে প্রাণের প্রথম চিহ্ন, এক্সট্রামরফিক মাইক্রোবস (extramorphic microbes)। হয়ত এমন মাইক্রোবস থেকেই আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে এক সময় প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল।

আরও মজার স্টোরি:

ক্যাটাগরিঃ ভ্রমণ