ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী বালিয়া মসজিদ

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaভ্রমণঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী বালিয়া মসজিদ

মসজিদটি তৈরি হয়েছিল এক রাতেই। জ্বীন-পরীরা সারারাত জেগে এই মসজিদ বানিয়েছে। অনেক রকমের কারুকার্যময় অলংকরণ ও পুরো দেয়াল গড়তে গড়তে রাত শেষ হয়ে যায়। দিনের আলোয় জ্বীন-পরীরা থাকে না, তাই গম্বুজের কাজ শুরু না করেই তারা চলে যায়। অসম্পূর্ণ থেকে যায় মসজিদটি- ঠাকুরগাঁওয়ের প্রাচীন মসজিদ সম্পর্কে প্রচলিত আছে এমনই লোককাহিনী।

ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে উত্তর দিকে পঞ্চগড় মহাসড়ক ধরে দশ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই ভুল্লি বাজার। সেখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পূর্বে বালিয়া ‘জ্বীন মসজিদ’ নামে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি অবস্থিত।

মসজিদটি দেখতে দেখতে একটু ভেতরে প্রবেশ করতেই হঠাৎ রমজান আলী নামে একজন বলে উঠলেন ভাই কাউকে খুঁজছেন। এরপর তার মুখ থেকে শোনা গেলো এই জ্বীনের মসজিদের নামকরণের গল্পটি।

তিনি জানান, কোনো এক অমাবস্যার রাতে জ্বীন-পরীরা বালিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় এলাকাটি তাদের পছন্দ হয়। তারপর জ্বীন-পরীরা মাটিতে নেমে এসে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করে। কিন্তু গম্বুজ তৈরির আগেই ভোর হয়ে যাওয়াতে কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায় তারা। ফলে গম্বুজ ছাড়া দাঁড়িয়ে আছে অসাধারণ কারুকার্যময় এই মসজিদটি। জ্বীন-পরীরা কিছু অংশ তৈরি করেছে বলে স্থানীয়দের কাছে এটি জ্বীনের মসজিদ নামে পরিচিত।

balia masjid thakurgaon
অসাধারণ কারুকার্যময় ঐতিহ্যবাহী বালিয়া মসজিদ

স্থানীয় বাসিন্দা ইবরাহিত আলী বলেন, মসজিদটির বয়স প্রায় ১১০-১১২ বছরের মতো হবে। আমাদের এই এলাকাটি একটি উঁচু ও পিরামিড আকৃতির ছিল। বন জঙ্গলের মধ্যেই ছোট্ট একটি মসজিদ ঘর নির্মাণ করে এলাকার মানুষ নামাজ আদায় করত। এরপর মসজিদ কমিটি ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় এই মসজিদের বাকি কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।

মসজিদের গায়ে খোদাই করা সন অনুসারে এটি নির্মিত হয় ১৩১৭ বঙ্গাব্দে মানে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদের নির্মাতা মেহের বকস চৌধুরীর কবরেও তার মৃত্যুর সন খোদাই করা আছে ১৩১৭ বঙ্গাব্দ। মেহের বকসের মৃত্যুর সময়েই মসজিদটির বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়ে যায়।

জমিদার মেহের বকস চৌধুরী উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বালিয়াতে এক মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা করেন। এ জন্য দিল্লির আগ্রা মতান্তরে মুর্শিদাবাদ থেকে স্থপতি আনা হয়। মুঘল স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী ডিজাইনকৃত এই মসজিদ তৈরি করাটা ছিল অনেক জটিল ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। হঠাৎ প্রধান স্থপতির মৃত্যুর ফলে মসজিদ নির্মাণের কাজ থেমে যায়। মেহের বকস স্থানীয় কারিগরের সহায়তায় পুনরায় মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কিন্তু স্থানীয় কারিগররা মসজিদের গম্বুজ নির্মাণে ব্যর্থ হন। ১৯১০ সালে মেহের বকস চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন।

এরপর মেহের বকসের ছোট ভাই কয়েক বছর পর মসজিদটি নির্মাণের জন্য আবারও উদ্যোগ নেন। কিন্তু নির্মাণ কাজ সমাপ্ত না করে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। ফলে মসজিদটি গম্বুজ ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকে।

অবশেষে মেহের বকস চৌধুরীর ছেলে মরহুম বসরত আলী চৌধুরীর কন্যা বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি তসরিফা খাতুন ২০১০ সালে ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় বালিয়া মসজিদটির সংস্কার কাজ শুরু করে। একই সঙ্গে আর্কিটেক্ট সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুশলের নকশায় নতুন ভাবে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়।

জ্বীনের মসজিদ নামে পরিচিত

মসজিদটি সমতল ভূমি হতে ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উঁচু প্লাটফর্মের ওপর পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি ও উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি আয়তাকার কমপ্লেক্স অবস্থিত। আয়তাকার কমপ্লেক্সটি সিঁড়িসহ প্রবেশপথ, খোলা চত্বর ও মূলভবন বা নামাজঘর এই তিন অংশে বিভক্ত। এর মধ্যে মূল ভবনটি পূর্ব-পশ্চিমে ২৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্থ। প্লাটফর্ম হতে মসজিদটির ছাদ ১৭ ফুট উঁচু।

মসজিদের ছাদে একই সাইজের তিনটি গম্বুজ ও আটটি মিনার আছে। যার মধ্যে চার কোণের চারটি মিনার বড় এবং বাকি চারটি ছোট। ভিত্তিসহ পুরো মসজিদটিই চুন-সুরকির মর্টার এবং হাতে পোড়ানো ইট দিয়ে নির্মিত। ইটে কোনো কাজ না থাকলেও মসজিদের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ইট কেটে কলস, ঘণ্টা, ডিস, বাটি, আমলকি, পদ্ম ইত্যাদি নকশা তৈরি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি এই ঐতিহাসিক বালিয়া মসজিদে গিয়েছিলাম। আসলেই মসজিদটি দেখতে অনেক সুন্দর। বিশেষ করে সেখানকার দেয়ালগুলোতে যে নকশা আঁকা আছে সেটি চমৎকার। আমরা ঠাকুরগাঁও বার্ড ক্লাবের সঙ্গে মিলে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করছি। সেখানে ঠাকুরগাঁও জেলার অনেক ঐতিহাসিক জিনিস আমার সকলের মাঝে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। সেই ডকুমেন্টারির মধ্যে আমরা এই মসজিদটিও রেখেছি।

তিনি আরও জানান, বালিয়া মসজিদের ব্যাপারে কোনো রকমের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তা অবশ্যই করা হবে।

সূত্র: বার্তা২৪

ক্যাটাগরিঃ ভ্রমণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.