শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উপায়

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaকিডসশিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উপায়
Advertisements

বই থেকে তৈরী হতে পারে সন্তান ও অভিভাবকদের মধ্যে একটি সুস্থ্য সম্পর্ক, যা হবে সুদৃঢ় ও বন্ধুত্বপূর্ণ। বই পড়ার মাধ্যমে আমরা অন্য এক জগতে হারিয়ে যাই, চোখ বুজলেই যেন দেখতে পাই চরিত্রগুলোকে। এখানে মূল সার্থকতা লেখকের হলেও পাঠকের কল্পনাশক্তি ব্যতীত এ অসাধ্য সাধন হতে পারে না। তাইতো আমরা নতুন প্রজন্মকে এই অসাধারণ কল্পনাশক্তির বীজ তুলে দিতে চাই তার পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে।

পাঠ্যপুস্তককেও এরকম আনন্দদায়ক করে তোলা যায় পাঠকের কল্পনাশক্তির মাধ্যমে। আজকের তরুণ শিক্ষার্থীরা যে পড়ার বইয়ে মনোযোগ রাখতে পারে না, তার মূল কারণ এটাই – তাদের বই পড়ার অভ্যাসের অভাব। এ অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য একদম ছেলেবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি ভালবাসা গড়ে তুলতে হবে। আর এজন্য বাচ্চাদের অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব শুরু হয়ে যাবে আপনার শিশুটি কথা বলতে শুরু করার সাথে সাথেই।

এরকম কিছু পদক্ষেপ যা আপনার শিশুটিকে আমাদের সমাজের একজন অসাধারণ মূল্যবান পাঠক হিসেবে বড় করবে।

বাচ্চাকে ঠিক কোন বয়েস থেকে বই পড়ানো যেতে পারে?

শিশুকে যত তাড়াতাড়ি বই পড়ানোর অভ্যাস করানো যায়, ততই ভালো। শিশুর যখন বয়েস দুই বছর তখন থেকেই যদি বাড়িতে বই পড়ার একটা পরিবেশ গড়ে তোলা যায় খুব ভালো হয়। নিয়মিতভাবে রাত্রে অন্তত পনেরো মিনিট শিশুকে কোলের কাছে নিয়ে বইয়ের পাতা উল্টোন। বই পড়তে, দেখতে ও পাতা উল্টোতে অভ্যস্ত হলে পরবর্তীকালে পড়াশোনা করার সময় ধৈর্য্য সহকারে মনোযোগ দিতে ওর অসুবিধা হবে না। প্লে স্কুলে পাঠানোর আগেই, বাড়িতেই গড়ে তুলুন পড়ার পরিবেশ। এতেই শিশুর শেখার ইচ্ছে জাগবে।

শিশুর অন্তরে ‘কি‘ প্রশ্নটি জাগ্রত রাখুন সর্বদা

একটু শিশু সর্বপ্রথম যে অর্থবোধক শব্দটি উচ্চারণ করতে শেখে তা হচ্ছে “মা”। এর পরপরই যা বলতে শেখে তা সম্ভবত “কি” শব্দটি। সে যখনি কিছু দেখে সে জানতে চায় “এটা কি?”, “তাহলে ওটা কি?” সে একটু বড় হলেই আশেপাশের সবকিছু নিয়ে জানতে চায়; তার চোখে থাকে রাজ্যের বিস্ময়। এসময় আপনার কাজ হবে তার এই ‘কি’ প্রশ্নের ক্রমাগত উত্তর দেয়া। এখানে লক্ষ্য রাখার বিষয় হচ্ছে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে যেন আপনি ক্লান্ত হয়ে না যান, এবং রেগে গিয়ে তাকে ধমক না দেন। ভাবছেন, এই ‘কি’ প্রশ্ন জাগিয়ে রাখার সাথে বই পড়ার কি সম্পর্ক? আপনি তার এই উৎসুক মনটার সাহায্য নিয়েই তার সাথে বইয়ের সম্পর্ক জুড়ে দিতে পারেন খুব ছোট বয়সেই! আপনি তার এই জানার আগ্রহের সাহায্য নিয়েই তার হাতে তুলে দিতে পারেন মজার মজার সব বই যা পড়ে তার জানার পরিধি এবং বইয়ের প্রতি ভালবাসা বাড়বে।

বইয়ের সাথে প্রকৃতির সাদৃশ্য খুঁজে বের করতে সাহায্য করুন

এখন আপনার কাজ হবে কিছু রঙিন ছবি সমৃদ্ধ বই কিনে আনা। এরপর আপনি আপনার সোনামণিকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে বের হবেন এবং আশেপাশে যা দেখবেন তা বইয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলবেন, “দেখ, বাইরে যা আছে, তোমার বইতেও তা আছে।”
এরপর বাসায় এসে তাকে বই দেখে দেখে একটা একটা জিনিস দেখিয়ে জিজ্ঞেস করুন “এটা কি?” তখন সে নিজে নিজেই ছবি দেখে বলে দেবে আজকে পার্কে সে কি কি দেখেছে!

নিয়মিত পড়ার আগ্রহ গড়ে তুলুন একটু ভিন্নভাবে

যখন সে আশেপাশের সবকিছুর সাথে বইয়ের মিল খুঁজে পাবে, তখন সে আপনা আপনিই বইয়ের সাথে লেগে থাকবে দিনরাত, অনেকটা সময় কাটাবে ছবিগুলো চিহ্নিত করতে করতে।

এখন আপনার কাজ হবে তার জন্য নতুন নতুন বই কিনে আনা। দেখবেন, এতে করে দেখবেন নতুন আসার পূর্বেই সে আগের বইগুলো আপাদমস্তক দেখে ফেলেছে, এবং নতুন বই আসার জন্য দারুণ উদ্যমে অপেক্ষা করছে! এভাবে তার মনের অজান্তেই আপনি বইয়ের সাথে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিচ্ছেন যা আজীবন তাকে সাহায্য করবে।

বর্ণমালা শেখার পালা

আপনার সন্তান এখন বইয়ে ছবি দেখলেই বলে দিতে পারে এটা কবুতর না দোয়েল, আলাদা করতে পারে বাঘ এবং বিড়াল।

এই সুযোগেই আপনি বর্ণমালার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন শিশুটিকে। তবে মনে রাখা উচিত, এ সময় আপনি কখনোই ‘অ’ হতে ‘ঐ’ পর্যন্ত কিংবা ‘ক’ হতে ‘চন্দ্রবিন্দু’ পর্যন্ত মুখস্ত করাতে যাবেন না। এতে তার মস্তিষ্কের উপর যেমন অযথা চাপ পড়বে, সাথে সাথে সে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এরচেয়ে বরং আপনি তাকে একটি একটি করে বর্ণ চেনাতে আরম্ভ করুন, কোন ধারাবাহিকতা না রেখেই।

প্রথমে ‘কার’ ও ‘ফলাবিহীন’ শব্দ যেমন ‘কলম’ ‘বয়স’ ইত্যাদি দিয়ে শুরু করুন। এরপর ধীরে ধীরে যুক্তবর্ণগুলোও চিনিয়ে দিন।

একটা ভাল উপায় হতে পারে খবরের কাগজের শিরোনাম দেখিয়ে তাকে বর্ণ চিনতে বলা। আপনি বলতে পারেন, “দেখ, তোমার বইয়ে যে শব্দটি আছে, এখানেও লাল কালি দিয়ে ঐ একই শব্দ লেখা আছে!” সে তখন উৎসুক চিত্তে বই থেকে শব্দ ও বর্ণগুলো খুঁজে বের করবে।

কল্পনার জগৎকে ভরিয়ে তুলুন বইয়ের রাজ্যে

আপনার সন্তান যখন একটু বড় হবে, ভালমত পড়তে শিখবে, তখনই তাকে এমন কিছু বই দিন যেখানে থাকবে ছবিসহ বনের পশুপাখির গল্প যেমনঃ খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প, সিংহ ও ইঁদুরের গল্প ইত্যাদি।
এসময় শিশুদের ছন্দের প্রতি প্রচন্ড আকর্ষণ থাকে। তাকে কিছু ছড়াও শিখিয়ে দিতে পারেন এই ফাঁকে; এ সবকিছুই তার পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াবে।

এবারে গল্পের বই হাতে নেবার সময়

এবারে তাকে গল্পের বই পড়তে দিন। গল্পের বইয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই মজাদার বই পড়তে দিন। ছড়ার বইয়ে শিশুদের আগ্রহ বেশিদিন থাকে না, গল্প পড়তে শিখলে সে আর ছড়ার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ পাবে না। গল্প পড়তে গিয়ে শিশুটি মাঝে মাঝেই দুই-একটা কঠিন শব্দের মুখোমুখি হবে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি বইটি শিশুকে পড়তে দেয়ার আগে আপনি নিজেই একবার পড়ে নেন। বিভিন্ন পশুপাখির গল্পের বইয়ের সাথে সাথে কিছু নীতিকথা বিষয়ক গল্প পড়তে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে আমাদের বাছাই করা বইগুলো থেকে বেছে দিতে পারেন। সুকুমার রায়ের লেখাগুলো কিনে দিন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি কিশোর কালেকশন রয়েছে। আরেকটু বড় হলে পড়তে দিতে পারেন আবদুল্লাহ আল মুতির বিজ্ঞান বিষয়ক কিশোর গ্রন্থগুলো, যা বাংলাভাষার অন্যতম সম্পদ, সাথে জাফর ইকবালের শিশুদের জন্য লেখা বিজ্ঞানের গল্পগুলোও কিনে দিন। তবে সন্তানের বই পড়ার অভ্যাস গড়তে সুবিধে হবে যদি আপনার নিজেরও বই পড়ার অভ্যাস থাকে। ছুটির দিনগুলোর দুপুরে কিংবা অন্য অলস সময়গুলোতে আপনি নিজেই যদি একটা বই নিয়ে পড়তে বসেন, দেখবেন আপনার সন্তানের মধ্যেও তা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।

প্রতি সপ্তাহে একবার বই কিনতে নিয়ে যান

Children in library to buy books

এই অভ্যাসটি গড়ে তুলতে পারলে আপনার শিশুটি পাঠক হওয়ার পথে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। সপ্তাহের বন্ধের দিনগুলোতে আপনার সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন বইয়ের দোকান থেকে ঘুরে আসুন। এতে করে সে যেমন নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পাবে যা তাকে বইয়ের প্রতি আরো আগ্রহী করবে, একই সাথে বইয়ের দোকান এবং লাইব্রেরিতে যাওয়ার প্রতিও আগ্রহী করবে।

নিজস্ব সংগ্রহ গড়ে তুলতে সাহায্য করুন

আপনার বইয়ের তাকটি যদি আপনার পছন্দের বইয়ের সংগ্রহে পূর্ণ থাকে, সে নিজেও তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি তৈরি করতে ইচ্ছুক হবে । তার রুমে একটি বইয়ের তাক রাখুন অথবা তাকে আপনার নিজের বইয়ের তাক/আলমারি থেকে কিছু জায়গা করে দিন। সে হয়ত সযত্নে তার পছন্দের বইগুলো তার জন্য রাখা জায়গাটিতে সাজিয়ে রাখবে। এতে করে সে বইয়ের যত্ন নেয়া শিখবে এবং বই পড়ার প্রতি আরো বেশি আগ্রহী হবে।

এভাবে আপনার সন্তানের বয়স যখন ৬-৭ এ পৌঁছবে তখন দেখবেন আপনার সন্তান লিখিত যা কিছু পাচ্ছে তাই-ই পড়তে শুরু করছে। বয়স ৮-৯ এ পৌঁছে গেলে দেখবেন আপনার সন্তান এখন একজন নিয়মিত পাঠক যা আমাদের দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়ন্ত শিশুদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস তৈরীতে Oxford Learning এর পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এই পরামর্শগুলোকে ভিডিও ইল্লাস্ট্রেশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। দায়িত্বশীল পিতা-মাতাকে এই জন্য উপদেশগুলো তাদের সন্তানদের জন্য কল্যাণকরভাবে কাজে লাগাতে ভূমিকা রাখবে।

বই পড়ার অভ্যাসের মাধ্যমে মেধায়, মননে ও সৃজনশীলতায় আমাদের প্রজন্ম গড়ে উঠবে পরিশীলিত ও মানবীয় গুণে। আমরা যত বই পড়ব, মনের চক্ষু ততই খুলবে। আজকের দিনের অস্থির সমাজের অহমিকার ব্যারিকেড ভেঙে দিতে পারে বইপড়া আন্দোলন। আমাদের সন্তানদেরকে মোবাইল, ইন্টারনেট আর ফেসবুকের নেশা কাটিয়ে দিতে পারে বইয়ের নেশা। কিন্তু সে নেশাটি ধরাতে হবে অভিভাবকদের প্রাণান্তকর চেষ্টায়।

তাই আমাদের সন্তানদের হাতে বই তুলে দিতে হবে। একটি সুন্দর জামার চেয়ে, দামি মোবাইলের চেয়ে, কিংবা, রেস্তরাঁয় বসে হাজার টাকার উদরপূর্তি করার চেয়ে, বইয়ের গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। বই চিরকালের মননশীলতার সঙ্গী। আসুন বইকে আঁকড়ে ধরি। বই পড়ি, জীবন গড়ি।

ক্যাটাগরিঃ কিডস

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.