কোরবানির মাংস সংরক্ষণ: সঠিক উপায়

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaইসলামকোরবানির মাংস সংরক্ষণ: সঠিক উপায়
Advertisements

মহান আল্লাহ বছরে আমাদের জন্য দুটি শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন উপহার দিয়েছেন। এর একটি ঈদুল ফিতর অপরটি ঈদুল আজহা। এ দিনটিতে বিশ্বের মুসলমানগণ নিজ নিজ সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, গরু, দুম্বা কিংবা ছাগল কোরবানি করেন। কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফ্রিজে ঠাসাঠাসি করে কম-বেশি কোরবানির মাংস বিভিন্ন উপায়ে সংরক্ষণ করে থাকে। তবে এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।

কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করার আছে বিশেষ কিছু পদ্ধতি। জেনে নেয়া যাক কোরবানির কাঁচা মাংস কতদিন রাখা যায় এবং সংরক্ষণ করার পদ্ধতি সম্পর্কে।

পূর্ব প্রস্তুতি

কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজন কিছু পূর্ব প্রস্তুতির। কোরবানির দিন তাড়াহুড়ার মধ্যে যাতে কাজের ঝামেলা কিছুটা কম থাকে সেজন্যই প্রয়োজন কিছুটা পূর্ব প্রস্তুতির। আগেই ডিপ ফ্রিজের পুরানো খাবার সরিয়ে ফেলুন। ফ্রিজ একদম খালি করে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলাই ভালো। আগে থেকে জমে থাকা রক্ত ও ময়লা থেকে জীবাণু মাংসের কোয়ালিটি নষ্ট করে দিতে পারে। তাই ফ্রিজের পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত জরুরী। সেই সঙ্গে আগেই জমিয়ে রাখুন বড় বড় আকৃতির অনেকগুলো পলিথিন ব্যাগ। কারণ ঈদের দিন পলিব্যাগে করেই মাংসগুলো ফ্রিজে রাখতে হবে আপনার।

পরিচ্ছন্নতা

কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করার আগেই প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতার। খেয়াল রাখুন কসাইয়ের মাংস কাটার স্থানটি যেন পরিচ্ছন্ন হয়। ধুলাবালিযুক্ত স্থানে মাংস কাটলে রান্নার সময়ে খাবার বালি বালি লাগতে পারে। মাংস কাটা হয়ে গেলে সেগুলোর রক্ত পরিষ্কার করে পানি ভালো করে ঝরিয়ে নিন। এরপর প্যাকেটে ভরে ফ্রিজে রেখে দিন অথবা রান্না করুন।

সংরক্ষণ পদ্ধতি

গরুর মাংস সংরক্ষণ করার আছে নানান পদ্ধতি। প্রচলিত পদ্ধতিগুলো হলো:

ফ্রিজে রেখে মাংস সংরক্ষণ

ফ্রিজে রেখে মাংস সংরক্ষণ করাটাই সব থেকে সহজ পদ্ধতি। কিন্তু ফ্রিজে রেখে মাংস সংরক্ষণ করতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।

  • মাংস সংরক্ষণ করার আগে প্রথম ধাপ হলো আপনার ফ্রিজ পরিষ্কার করা। ঈদের সকালে কিংবা আগেই ফ্রিজ বন্ধ করে নিয়ে ফ্রিজের ভেতরের সব মাছ, মাংস বের করে ফ্রিজের ভেতরটা ভালমতো পরিষ্কার করে নিন। মাছ, মাংস রাখতে রাখতে ফ্রিজের ভেতরে একটা বাজে গন্ধ হয়ে যায়। তাই ঈদের আগে ফ্রিজ পরিষ্কার করে না নিইয়ে মাংস সংরক্ষণ করলে সেই মাংসে বাজে গন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
  • এবার আসি মাংস সংরক্ষণের কথায়। মাংস পানি দিয়ে ধুয়ে রক্ত পরিষ্কার করে নিন। এবার বড় চালনিতে করে মাংসের পানি ঝরিয়ে ফ্যানের নিচে রেখে মাংস শুকাতে দিন। সব পানি ঝরে গেলে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে মাংস ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন।
  • মাংস যদি ধুতে না চান তাহলে পরিষ্কার শুকনা কাপড় দিয়ে মাংসের গায়ে লেগে থাকা রক্ত ভালমতো মুছে নিন। এবার পলিথিনে করে ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ করুন।
  • ফ্রিজে মাংস সংরক্ষণ করার জন্য যে পলিথিন ব্যবহার করবেন তা একটু মোটা হওয়াই ভালো। তাহলে ফ্রিজ থেকে মাংস বের করার সময় প্যাকেট ছিঁড়ে যাবে না।
  • মাঝে মাঝে ফ্রিজে রাখা প্যাকেট গুলো একটু নাড়াচাড়া করুন। এতে করে প্যাকেট একটার সাথে অন্যটা লেগে যাবে না।
  • মাংস প্যাকেট করে ফ্রিজের ভেতর রাখার সময় দুই প্যাকেটের মাঝে মোটা কাগজ বা পাতলা কাঠের টুকরা দিতে পারেন, এতে করে মাংসের প্যাকেট একটার গায়ের সাথে অপরটা এঁটে যাবার চিন্তা থাকবে না।
  • মাংস সংরক্ষণ করার জন্য অবশ্যই পরিষ্কার পলিথিন ব্যবহার করুন। আগে ব্যবহার করা হয়েছে এমন পলিথিন না নেয়াই ভাল, কারন এতে মাংসে গন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
  • ফ্রিজে মাংস রাখার পর ফ্রিজের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিন। তাহলে মাংস দ্রুত শক্ত হবে।

জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ

জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতে হলে মাংসে চর্বির পরিমান একটু বেশি থাকাই ভাল। কারন এতে মাংস দীর্ঘদিন ভাল থাকে। প্রথমে মাংস ভাল করে ধুয়ে বড় একটা হাঁড়িতে নিন। এবার হলুদ ও লবন মিশিয়ে পরিমান মতো পানি দিয়ে মাংস জ্বাল দিন। এই মাংস দিনে কমপক্ষে ২ বার নিয়ম করে জ্বাল দিতে হবে।

রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ

ফ্রিজে ও জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ করা ছাড়াও রোদে শুকিয়েও মাংস সংরক্ষণ করা যায় । এই উপায়ে মাংস সংরক্ষণ করলে তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভালো থাকে।

  • রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতে হলে চর্বি ছাড়া মাংস নিতে হবে। মাংস পরিষ্কার করে ধুয়ে ছোট টুকরা করে নিন। এবার তারে একটার পর একটা মাংস গেঁথে নিন।
  • এবার তারে গাঁথা মাংস ছাদে বা বারান্দায় কাপড় শুকানোর মতো করে টানিয়ে দিন। এছাড়া চুলার উপরে তার বেঁধেও আগুনের তাপে মাংস শুকানো যায়। এই উপায়ে মাংস সংরক্ষণ করলে মাংসের সমস্ত পানি টেনে মাংস একদম শুকিয়ে যায়, ফলে দীর্ঘদিন তা ভালো থাকে।
  • ছাদে মাংস শুকাতে হলে পাতলা কাপড় বা নেট দিয়ে মাংস ঢেকে দিন। এতে করে ধুলোবালি পড়ে মাংস নোংরা হবে না।
  • পর পর ৫-৬ দিন মাংস রোদে দিন। মাংস শুকিয়ে একদম শক্ত হলে মুখ বন্ধ করা পাত্রে বা টিনের কৌটায় মাংস ভরে ভালমতো মুখ বন্ধ করে রাখুন। মাঝে মাঝে কৌটা ধরে মাংস রোদে দিন। তাহলে পোকার আক্রমন হবে না।
  • রোদে শুকানো মাংস রান্না করার আগে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা হালকা গরম পানিতে মাংস ভিজিয়ে রাখুন , এতে মাংস নরম হবে।

সতর্কতা

মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জেনে নিন সতর্কতাগুলো সম্পর্কে।

  • চর্বি ছাড়া মাংস খেতে, সাধারণত মাংস কাটা হয় কিউব আকারে। এভাবে কাটলে মাংসের মধ্যে চর্বির স্তরগুলো থেকেই যায়। এ জন্য মাংসের টুকরাগুলো স্তরে স্তরে কেটে চর্বির অংশটুকু বাদ দিন। সিনা, রান যে কোনো অংশ থেকেই এভাবে চর্বি বাদ দিয়ে শুধু লাল মাংসটুকু রাখা যেতে পারে।
  • মাংস রান্না করে রাখলে প্রতিদিনই জ্বাল দিতে হবে। এক্ষেত্রে গরম কালে মাংস ১২ ঘন্টা পর একবার এবং শীত কালে ২৪ ঘন্টা পর একবার জ্বাল দিলেই মাংস ভালো থাকবে।
  • ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার নিচে কাঁচা মাংস ৪ থেকে ৬ দিন রাখা যায়।
  • জিরো ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার নিচে রাখলে গরুর কাঁচা মাংস ১২ মাস ভালো থাকবে।
  • মাংস ফ্রিজে রাখার আগে প্যাকেটের গায়ে তারিখ লিখে দিন। এতে মাংসগুলো কতদিন সংরক্ষণ করা হয়েছে সেটা সহজেই বোঝা যাবে।
  • সবচেয়ে ভালো হয় যদি চর্বিসহ মাংসগুলো আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন।
  • মাংস ফ্রিজে রাখার পর ফ্রিজের দরজা খুব বেশি একটা না খোলাই উচিত। এতে ভেতরের ঠাণ্ডা হাওয়া বের হয়ে যেতে পারে। যার ফলে মাংস নরম থেকে যাবে।
  • অনেকেই বার বার ঝামেলার ভয়ে রান্না করা মাংস ফ্রিজে রেখে দেন। এক্ষেত্রে রান্না মাংস ছোট ছোট বক্সে রাখুন। প্রত্যেকবার বড় বক্স বের করে গরম করা এবং অল্প একটু খেয়ে বাকিটুকু আবার রেখে দিলে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.