চীন নিয়ে বিচিত্র সব তথ্য

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaভ্রমণচীন নিয়ে বিচিত্র সব তথ্য

চীন খুবই আকর্ষণীয় একটি দেশ। দেশটিতে প্রচুর মজার মজার ঘটনা রয়েছে। সেখানে এমনকিছু ঘটনা ঘটে যা বিশ্বে অদ্বিতীয়, রহস্যময়, বিচিত্র ও উত্তেজনাপূর্ণ। চলুন জানা যাক তাদের ঐতিহ্যগত কিছু ঘটনা সম্পর্কে।

খাবার টেবিলের আদব

এমনকিছু ঘটনা আছে যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে রীতিমতো অভদ্রতা হলেও চীনে তা গ্রহণযোগ্য। খাবার গ্রহণের কথাই বলা যাক। যার কিছু নিয়মনীতি আমাদের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু কিছু নিয়মনীতি একেবারেই ভিন্ন। যেমন- চেয়ারে বসতে বললে বসা, সর্বপ্রথম বড়রা খাবার খাওয়া শুরু করলেই কম বয়সীরা শুরু করবেন। এছাড়াও স্মার্টফোন থাকলে তা শব্দহীন করে রাখাও ভদ্রতার অংশ মনে করেন তারা।

স্মার্টফোন শব্দহীন করে রাখা ভদ্রতা হলেও খাবার খাওয়ার সময় থুথু ফেলা, হাই তোলা, ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করা, ঢেকুর তোলাকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আমাদের দেশে কিন্তু এই আচরণগুলো রীতিমতো বিরক্তিকর হিসেবে গণ্য করা হয়।

শিশুদের পায়খানার আদব

শিশুদের পায়খানা করানোর বিষয়টি চীনের ক্ষেত্রে খুবই অদ্ভুত। চীনের মায়েদের কাছে শিশুদের প্যাম্পারস আমাদের দেশের মতো এত জনপ্রিয় নয়।

চীনের শিশুদের প্যাম্পারসের পরিবর্তে তলা ছিদ্র বা ফালি করা প্যান্ট পড়ানো হয়। শিশুদের পায়খানা-প্রস্রাব করার ইচ্ছা হলেেএকটু উবু হলেই ফালি খুলে যায়। এতে প্যান্ট কোমর থেকে না নামিয়েই প্রস্রাব-প্রায়খানা করতে পারে। এই প্যান্টকে ওপেন ক্রোচ প্যান্ট, ওপেন ক্রোচ ট্রাউজার বা তলা ফালি প্যান্টও বলা হয়।

সবচেয়ে জনবহুল দেশ

চীন হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ। ২০১৭ সালে চীনের জনসংখ্যা ছিল ১৩৮ দশমিক ৬ কোটি। বর্তমানে এই জনসংখ্যা ১৪৩ কোটিরও অধিক। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৮ দশমিক ৪৭ ভাগ লোক চীনে বসবাস করছে। জনসংখ্যা অনেক বেশি হলেও প্রতি বর্গ কিলোমিটারের জনবসতি কিন্তু অনেক কম। কারণ দেশটির আয়তন অনেক বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ১৫৩ জন। আবার আয়তন বেশি হলেও, আয়তনে চীনের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তাদের চাইনিজ ভাষাতেই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে।

বিশ্বের বৃহত্তম সৈন্যবাহিনী

বিশ্বের বৃহত্তম সৈন্যবাহিনীর অধিকারী হচ্ছে চীন। ১৯২৭ সালে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি গ্রাউন্ড ফোর্স, চায়না’ নামে সৈন্যবাহিনী যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে চীনের সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা হচ্ছে ২০ লক্ষেরও অধিক। এই সংখ্যা প্যারিস ও বুদাপেস্টের জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।

পান্ডার মালিক

চীনকে পান্ডার মালিক বলা যায়। কারণ পান্ডা এখন শুধু চীনেই পাওয়া যায়। যদি বিশ্বের অন্য কোনো দেশে পান্ডা দেখা যায় তবে ধরে নিবেন তা চীন থেকেই ভাড়া করে আনা হয়েছে।

পান্ডাকে চীনের জাতীয় সম্পদ আখ্যায়িত করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিম-মধ্য চীনের পাহাড়ি ঢালের ঘন বাঁশবনে এরা বাস করে। এদের খাবারের শতকরা ৯৯ ভাগ হচ্ছে বাঁশের পাতা। তাই বাঁশবন হ্রাসের সাথে সাথে এদের সংখ্যাও দ্রুত কমে যাচ্ছে।

কুমারীত্ব পুনরুদ্ধার

গত সপ্তাহে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি সংবাদে জানা যায়, যুক্তরাজ্যে কুমারীত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য শল্যচিকিৎসাকে বেআইনি বলে ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।

চীনে কিন্তু এই প্রক্রিয়া খুবই প্রচলিত আছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘হাইমেনোপ্লাস্টি’ বা ‘হাইমেনোর‌্যাফি’। এখানে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে যোনির প্রবেশপথের ঝিল্লির একটি স্তরকে পুনরায় তৈরি করে দেওয়া হয়। এই ঝিল্লির স্তরকে অনেকে সতীচ্ছদ বলেন।

যদিও শল্যচিকিৎসায় কোনো সুবিধা নেই তবুও চীনের মেয়েরা বিয়ের পূর্বে হাইমেনোর‌্যাফি করান। এজন্য তারা প্রচুর অর্থও ব্যয় করেন। কারণ তারা ভবিষ্যত স্বামীকে দেখাতে চান যে তারা কুমারী ছিলেন।

গুহায় বসবাস

প্রযুক্তিগত দিকে দিয়ে অনেক উন্নত হলেও চীনে এখনো অনেক লোক গুহায় বসবাস করে। ২০১২ সালে প্রকাশিত তথ্যানুসারে জানা যায়, চীনে এখনো ৩০ মিলিয়ন লোক গুহায় বাস করে।

নববর্ষে দীর্ঘদিন ছুটি

নববর্ষ উপলক্ষে চীনে দীর্ঘদিন ছুটি দেওয়া হয়। তারা জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে নববর্ষ উদযাপন করে। নববর্ষের ছুটিতে প্রায় সকলেই কাজকর্ম বন্ধ করে পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে ছুটে যায়।

আইসক্রিমের উদ্ভাবক

উদ্ভাবনের দিক থেকে বর্তমানে চীনকে সকলেই চেনে। প্রযুক্তির নানা শাখায় এদের অবদান বর্তমানে যেমন দেখা যায় অতীতেও হয়তো তেমনই ছিল। এইতো যদি বলি আইসক্রিমের কথা। সেই আইসক্রিমের উদ্ভাবকও হচ্ছে চীন।

চীনে ৬১৮-৯৭ খ্রিস্টপূর্বে ৯৪ জন শ্রমিক মিলে প্রথম আইসক্রিম তৈরি করেছিল। ছোটখাটো এক বাটি আইসক্রিম তৈরির জন্যই এতোগুলো শ্রমিক খাটানো হয়েছিল। সে সময় মহিষের দুধ, ময়দা ও কর্পূর মিশিয়ে তৈরি করেছিল আইসক্রিম।

পুলিশ ডগস্কোয়াড নয়, রয়েছে পুলিশ ডাক স্কোয়াড

পুলিশ কুকুরের ব্যবহার সব দেশেই রয়েছে। জটিল জটিল বিষয়ে পুলিশ কুকুরের সাহায্যে নিয়ে থাকেন পুলিশ আধিকারিকরা। চীনের পুলিশের কাছে শুধু কুকুর নয়, রয়েছে নিজস্ব হাঁস। দূরের দৃষ্টি জন্য বিখ্যাত এই হাঁসগুলিকে রীতিমতো ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করা হয়।

গুগল, ফেসবুক বন্ধ

চীনে অনেক বড় বড় ওয়েবসাইটই বন্ধ রাখা হয়েছে। গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব কিন্তু চীনে গেলে আপনি চালাতে পারবেন না। কারণ চীন সরকার আপলোড ও ডাউনলোড করা তথ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায়। এ উদ্দেশ্যে তারা নিজেদের তৈরি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে।

দ্রুত সময়ে ভবন তৈরি

চীনের একটি কোম্পানি ২০১৫ সালে বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে দ্রুত সময়ে ভবন নির্মাণের দাবি করেছিল। কোম্পানিটি মাত্র ১৯ দিনে ৫৭ তলা ভবন নির্মাণ করেছিল।

সম্প্রতি চীনে নোভেল করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় রোগীদের চিকিৎসা সেবা সহজ করার জন্য মাত্র ১০ দিনে হাসপাতাল তৈরি করে। হুশেনশান নামের হাসপাতালটির আয়তন ২৫ হাজার বর্গ মিটার। এক হাজার শয্যার হাসপাতালটি দ্রুত নির্মাণ করে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে চীন।

বন্যপ্রাণী কেনাবেঁচা

প্রযুক্তিগত নানাদিক দিয়ে চীন উন্নতি করলেও এখনো সেখানে প্রচুর বন্য জীবজন্তু খাওয়া হয়। এজন্য সেখানে মাঝে মাঝেই ভয়াবহ রোগের বিস্তার ঘটে। বর্তমানে ছড়ানো নোভেল করোনা ভাইরাস বন্য জীবজন্তু থেকেই ছড়িয়েছে বলে গবেষকরা বলছেন। ঠিক যেমন খাদ্য হিসেবে বন্যপ্রাণী খাওয়ায় ১৭ বছর আগে প্রাণঘাতী সার্স ভাইরাস বিস্তার লাভ করেছিল।


চীন সম্পর্কে আরও মজাদার সব তথ্য

  • চীনে চপস্টিকের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর কাটা হয় ২০ মিলিয়ন গাছ। এ দেশে প্রতি বছর ৮০ বিলিয়ন জোড়া ডিসপজেবল চপস্টিক ফেলে দেয়া হয়। এগুলো ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। চপস্টিক দিয়ে টাইনানমেন স্কয়ারকে ২৬০ বার ঢেকে ফেলা যাবে। যে গাছগুলো কাটা হয় সেগুলো ২০ বছরের পুরনো।
  • চীনের রেললাইন পুরো পৃথিবী দু’বার ঘুরে আসতে পারবে। চীনে চালু রয়েছে এমন রেললাইনের দৈর্ঘ্য ৯৩ হাজার কিলোমিটার।
  • চীনে যে পরিমাণ কয়লার মজুদ রয়েছে তা ৫৭৫ মিলিয়ন নীল তিমির ওজনের সমান। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ কয়লা চীনেই রয়েছে, যার পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন টন। বিশ্বের ৪৫ শতাংশ কয়লা চীনে উত্তোলন করা হয়।
  • মাত্র দুই বছর সময়ের ব্যবধানে চীনে যে পরিমাণ সিমেন্ট উৎপাদন করা হয়, তা বিশ শতকে আমেরিকা যা উৎপাদন করেছিল তার চেয়েও বেশি। বিশ্বের চাহিদার ৬০ শতাংশ সিমেন্ট চীনে উৎপাদিত হয়।
  • প্রতি বছর ১০ লাখ চীনা নাগরিক ধূমপানে মারা যান। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের এক হিসাবে দেখা যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর তিন মিলিয়ন মানুষ মারা যাবেন।
  • অলিম্পিকের সুইমিং পুলের সমান অর্থাৎ ১.২৪ বিলিয়ন সুইমিং পুলের সমান প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ রয়েছে চীনে। এর পরিমাণ ১০৯.৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট।
  • চীনে বছরে যে পরিমাণ নুডলস খাওয়া হয়, তা দিয়ে আলজেরিয়ার সব মানুষকে এক বছর ধরে প্রতিদিন তিনবেলা খাওয়ানো যাবে। ২০১১ সালে ৪২.৫ বিলিয়ন প্যাকেট নুডলস খাওয়া হয়।
  • প্রতি বছর চীনে পাঁচ হাজার ২০০টি আইফেল টাওয়ারের ওজনের সমান শূকরের মাংস খাওয়া হয়। ২০১২ সালে ৫২ মিলিয়ন টন এবং ২০১১ সালে ৫১.৬ মিলিয়ন টন শূকরের মাংস খাওয়া হয়েছিল।
  • চীনের সেরা ২০ ধনী ব্যক্তির মোট সম্পদের পরিমাণ হাঙ্গেরির জিডিপির চেয়েও বেশি। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৪৫.১ বিলিয়ন ডলার। হাঙ্গেরির মোট জিডিপি ১২৪ বিলিয়ন ডলার।
  • চীনে ৩০ মিলিয়নের বেশি মানুষ গুহায় বাস করে যা সৌদি আরবের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। সানজি প্রদেশে বেশিরভাগ গুহাবাসী রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট জি শিনপিং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সানজিতে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় গুহায় বাস করতেন।
  • চীনের আকার প্রায় আমেরিকা মহাদেশের সমান, অথচ একটি টাইম জোন রয়েছে। বেইজিং স্ট্যান্ডার্ড টাইম জোন গোটা চীনের টাইম জোন। চীনে পাঁচটি টাইম জোন থাকলেও ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং একটি টাইম জোনের ঘোষণা করেন। ফলে চীনের অনেক স্থানেই বেলা ১০টায় সূর্য ওঠে।
  • পৃথিবীর অর্ধেক শূকর রয়েছে চীনে। এর সংখ্যা ৪৭৫ মিলিয়নের মতো। এ দেশেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পরিমাণ শূকর খাওয়া হয়।

চীন দেশটি বিশ্বে খুবই আলোচিত একটি দেশ। প্রযুক্তিগত দিক থেকে ব্যাপক উন্নতি সাধন করলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে তারা হয়তো একটু বেশিই উদার। এই দেশটিই কিন্তু বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে।

ক্যাটাগরিঃ ভ্রমণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.