মুসলিম বিজ্ঞানীদের জ্যোতির্বিজ্ঞানে (Astrology) অপরিসীম অবদান

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaইসলামমুসলিম বিজ্ঞানীদের জ্যোতির্বিজ্ঞানে (Astrology) অপরিসীম অবদান
Advertisements

জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astrology) কী?

জ্যোতির্বিজ্ঞান হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রাচীনতম শাখাগুলোর অন্যতম। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে দেখা যায় প্রাচীন ব্যাবিলনীয়, গ্রিক, ভারতীয়, মিসরীয়, নুবিয়ান, ইরানি, চিনা, মায়া ও বেশ কয়েকটি আমেরিকান আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী নিয়মবদ্ধ পদ্ধতিতে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করত।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যোতির্মিতি, সেলেস্টিয়াল নেভিগেশন, পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পঞ্জিকা প্রণয়নের মতো নানা রকম বিষয় ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্তর্গত। তবে আজকাল পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানকে প্রায়শই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের সমার্থক মনে করা হয়।

পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞান দুটি উপশাখায় বিভক্ত। পর্যবেক্ষণমূলক ও তাত্ত্বিক।জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুগুলোকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই সব তথ্য পদার্থবিজ্ঞানের মূল সূত্র অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ। অন্যদিকে তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে এসব বস্তু ও মহাজাগতিক ঘটনাগুলো বর্ণনার জন্য কম্পিউটার বা অন্যান্য বিশ্লেষণধর্মী মডেল তৈরির কাজ করা হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই দুটি ক্ষেত্র পরস্পরের সম্পূরক। তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের ফলাফলগুলোর ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাত্ত্বিক ফলাফলগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

অনেকে আবার জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রকে এক করে ফেলেন। এই দুটি বিষয়ের উৎস এক হলেও বর্তমানে তা সম্পূর্ণ পৃথক দুটি বিষয় হিসেবেই ধরা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনাবলির বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে জ্যোতিষীগণ দাবি করেন, মহাজাগতিক বস্তুগুলোর অবস্থান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান

যুগে যুগে বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমান পণ্ডিতগণ অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। অনেক কিছুর আবিষ্কারও করেছেন তারা। এসব কাজে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তৎকালীন মুসলিম শাসকগণ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণায় অকাতরে অর্থ বিলিয়েছেন এই সামর্থ্যবানরা।

এসব গবেষণাকর্ম পরবর্তী যুগে বিজ্ঞানের উন্নতিতে ব্যাপকভাবে সহায়ক হয়েছে। তেমনিভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান অসামান্য। প্রথম সৌর বছরের মান হিসাব করা, পেন্ডুলাম ও দোলক ব্যবহার, ক্যামেরা ও চশমা আবিষ্কারসহ অনেক কিছুই সম্ভব হয়েছে মুসলিম পণ্ডিতদের হাত ধরে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী মুসলিমদের অবদান নিয়ে আজকের আয়োজন।

Muhammad ibn Musa al-Khwarizmi
Muhammad ibn Musa al-Khwarizmi

মুহাম্মদ ইবন মুসা আল-খাওয়ারিজমি (৭৮০-৮৫০ খ্রিস্টাব্দ)

ইসলামের ইতিহাসের অনন্যসাধারণ বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবন মুসা আল-খাওয়ারিজমি (Muhammad ibn Musa al-Khwarizmi) (৭৮০-৮৫০ খ্রিস্টাব্দ) জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কেও অসাধারণ আলোচনা করেন। তাঁর তৈরি নির্ঘণ্ট পরবর্তী সময়ে সম্পাদিত হয় এবং এডোলার্ড কর্তৃক লাতিনে অনূদিত হয়, যার ওপর ভিত্তি করে রচিত হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ।

খাওয়ারিজমি চন্দ্র, সূর্য ও তখনকার আমলে জানা পাঁচটি গ্রহের গতিবিধির চমৎকার ছক তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ, সূর্যের উত্তরায়ণ-দক্ষিণায়ন, ঋতু পরিবর্তন প্রভৃতির হিসাব সংবলিত ছকগুলোও তিনি আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং বিভিন্ন ত্রিকোণমিতির হিসাবও এসেছে তাঁর রচনায়।

Jābir ibn Sinān al-Raqqī al-Ḥarrānī aṣ-Ṣābiʾ al-Battānī
Jābir ibn Sinān al-Raqqī al-Ḥarrānī aṣ-Ṣābiʾ al-Battānī

জাবির ইবনে সিনান আল-বাত্তানি (৮৫৮-৯২৯ সাল)

নিজের সময়ের তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নয়নে অন্যতম একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বলে গণ্য হন জাবির ইবনে সিনান আল-বাত্তানি (Jābir ibn Sinān al-Raqqī al-Ḥarrānī aṣ-Ṣābiʾ al-Battānī)। পাশাপাশি গণিতেও আছে তার বিশেষ অবদান। তিনি আলবাটেগনিয়াস, আলবাটেগনি বা আলবাটেনিয়াসসহ একাধিক ল্যাটিন নামেও পরিচিত। সংক্ষেপে আল-বাত্তানি বলেই চেনে সবাই। তিনি বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করেছিলেন বেশ সূক্ষ্মভাবে।

কোনো প্রকার টেলিস্কোপের সাহায্য ছাড়াই কেবল খালি চোখের পর্যবেক্ষণ এবং গণিতের প্রয়োগে তিনি সে সময়েই এক সৌর বছরের মান হিসাব করেন যার সঙ্গে আজকের আধুনিক হিসাবের (৩৬৫দিন ৫ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট ৩০ সেকেন্ড) সঙ্গে মাত্র তিন মিনিটের গরমিল পাওয়া গেছে।

আল-বাত্তানি পৃথিবীর বিষুবরেখার মধ্য দিয়ে যাওয়া কাল্পনিক সমতলের সঙ্গে সূর্য ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে যে সমতল, তা অসদৃশ বলে ব্যাখ্যা করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি এই দুই কাল্পনিক সমতলের মধ্যকার কোণ পরিমাপ করেন। এই কোণকে বলা হয় ‘সৌর অয়নবৃত্তের বাঁক’। আল-বাত্তানি পরিমাপ করেন ২৩ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট যা বর্তমানের সঠিক পরিমাপ ২৩ ডিগ্রি ২৭ মিনিট ৮.২৬ সেকেন্ডের খুবই কাছাকাছি। তার এসব জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় তথ্য রেনেসাঁর যুগে ইউরোপীয় সব জোতির্বিজ্ঞানীর কাছে তুমুল প্রিয় ছিল। তারা আল-বাত্তানির কাজের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন।

৫৭ অধ্যায় সংবলিত তার লেখা ‘আল-জিজ আল-সাবি’ একটি অসাধারণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সংকলন যা ষোড়শ শতকে ‘ডি মটু স্টেলারাম’ নামে ল্যাটিনে অনূদিত হয়। আর্মিলারি স্ফিয়ারের উদ্ভাবক তিনি না হলেও তার তৈরি স্ফিয়ার ছিল আগের সব যন্ত্রের চেয়ে নিখুঁত এবং উন্নতমানের। এই যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সম্বন্ধীয় যুগান্তকারী তথ্য দেন।

কোনো প্রকার টেলিস্কোপের সাহায্য ছাড়াই কেবল খালি চোখের পর্যবেক্ষণ এবং গণিতের প্রয়োগে তিনি সে সময়েই এক সৌর বছরের মান হিসাব করেন।

আল-বাত্তানির বাবা জাবির ইবনে সিনান ছিলেন জাবির হারান শহরের একজন বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা। বাবার মতো আল-বাত্তানিও বাদ্যযন্ত্র নির্মাণকৌশল রপ্ত করেন। পরিমাপনে অত্যন্ত পরিপক্ব হওয়ায় তার তৈরি বাদ্যযন্ত্রগুলো হতো উন্নতমানের। তবে আল-বাত্তানি বেশি তৈরি করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় যন্ত্রপাতি। তার জন্মসাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ধরে নেওয়া হয় ৮৫৮ সালে আধুনিক তুরস্কের উরফা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

Ibn Yunus

[adinserter block=”1″]

ইবনে ইউনুস (৯৫০ বা ১০০৯ সাল)

অগ্রজ মুসলিম বিজ্ঞানীদের মতো ইবনে ইউনুসও (Ibn Yunus) সূর্যের পরিক্রমণ পথের ক্রান্তি-কোণের কৌণিক মান নির্ধারণ করেন আর যা পুরোপুরিই সঠিক। তারকারাজির গতিবিধির যে মাপ ও পরিমাণ ইবনে ইউনুস আবিষ্কার করেন তা অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের চেয়ে সঠিক। এটাকে ইবনে ইউনুসের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে মনে করা হয়। ইউরোপে ইবনে ইউনুস ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত ছিলেন অখ্যাত।

১৮০৪ সালে তার গবেষণা ও পঞ্জিকা পরিচিতি ফ্রেঞ্চ ভাষায় প্রকাশিত হয়। এরপর পশ্চিমা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তার রচনার প্রতি মনোনিবেশ করেন, যার ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ইবনে ইউনুসের অবদান দৃশ্যপটে আসতে শুরু করে। ইবনে ইউনুসের পঞ্জিকার মাধ্যমে পশ্চিমের বিজ্ঞানীরা নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে ইউনুসের করা মহাবিষুব, সংক্রান্তি, গ্রহসংযোগ, নক্ষত্রের সাময়িক অদৃশ্যকরণ, যেমন চাঁদের পেছনে দূরের কোনো তারা বা নিহারিকা বা গ্রহের সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যাওয়া সংক্রান্ত নানা পর্যবেক্ষণের দীর্ঘ গবেষণা রয়েছে যা সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন পরিবর্তনের ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করে।

মূলতঃ সময় নির্ণয়ে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি সফলতা লাভ করে। তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের জলঘড়ি ছিল। এদের মধ্যে ছিলেন মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে ইউনুস, যিনি সময় নির্ণয়ের বিষয়টি সংশোধন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন। সময় নির্ণয়ের জন্য সর্বপ্রথম তিনিই পেন্ডুলাম ও দোলক ব্যবহার করেন।

Ibn al-Haitham
Ibn al-Haitham

ইবনুল হাইসাম (৯৬৫-১০৪০ সাল)

আমিরুজ জিল্লি ওয়াননুর বা আলো-ছায়ার সম্রাট ইবনুল হাইসাম (Ibn al-Haitham)। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক হিসেবেও হাসান ইবনুল হাইসাম অধিক পরিচিত। তার অনবদ্য রচনা হলো- ‘কিতাবুল মানাজের’ যাতে রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য আলো-অন্ধকার ও দৃষ্টিবিদ্যার অসংখ্য অজানা তথ্য। এসব তথ্য দৃষ্টিবিদ্যার জগতে দিয়েছিল জ্ঞানের বিপ্লব।

তিনিই সর্বপ্রথম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আলোর সংজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আলো হলো এমন একটি উজ্জ্বল তরঙ্গরেখা যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আছে যা সোজা পথে বিচ্ছুরিত হয়। বাতাসের মতো বাঁকা হয়ে ছড়ায় না।’ আলো যখন তার উৎস থেকে বের হয়ে কোনো স্থানে পতিত হয় বা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেখান থেকে আবার বিপরীত দিকে বিচ্ছুরিত হয়। এখানে তার আবিষ্কৃত গুরুত্বপূর্ণ থিওরি হলো আলো বিপরীত দিকে বিচ্ছুরিত হওয়ার সময় ওই স্থানের রং ও প্রতিচ্ছবিসহ বিচ্ছুরিত হয়। এটা তিনি প্রমাণ করেও দেখিয়েছেন।

বহু গবেষকের মতে, ইবনুল হাইসামের এই আবিষ্কারের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছিল। ক্যামেরার পূর্ণ নাম হলো ক্যামেরা অবষ্কোরা। পরবর্তীতে তা আধুনিক ফটোগ্রাফিক ক্যামেরায় রূপান্তরিত হয়। আর এর নাম ক্যামেরাই থেকে যায়। বিভিন্ন ধরনের কাচের মাধ্যমে বস্তু বড় ও স্পষ্ট দেখায় তা তিনিই আবিষ্কার করেন। এ থেকেই চশমার সৃষ্টি হয়।

তিনিই রিফলেকশন তত্ত্বের জনক। বহু বিজ্ঞানী ও গবেষক ইবনুল হাইসামকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক বলেছেন।

Al-Biruni
Al-Biruni

আল বিরুনি (৯৭৩-১০৪৮ সাল)

বুরহানুল হক আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল বিরুনি (Al-Biruni)। সংক্ষেপে আল বিরুনি নামে পরিচিত। ৯৭৩ সালে খাওয়ারিযমের নিকটবর্তী আল বিরুন নামক স্থানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আল বিরুনি ছিলেন মধ্যযুগীয় শ্রেষ্ঠ মুসলিম পণ্ডিত, মহাজ্ঞানী ও নিষ্ঠাবান গবেষক। তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী বড় দার্শনিক ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, পদার্থ, রসায়ন ও জ্যোতিষশাস্ত্রে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবীসহ গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। অথচ কোপার্নিকাসের জন্মের ৪২৫ বছর আগে আল বিরুনি বলে গেছেন, পৃথিবী বৃত্তিক গতিতে ঘোরে। তিনি টলেমি ও ইয়াকুবের দশমিক অঙ্কের গণনায় ভুল ধরে দিয়ে তার সঠিক সমাধান দেন। তিনিই সর্বপ্রথম অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। তিনিই প্রথম প্রাকৃতিক ঝরনা ও আর্টেজিয় কূপের রহস্য উদঘাটন করেন।

আল বিরুনি একজন খ্যাতনামা জ্যোতিষীও ছিলেন। তিনি যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করতেন সেগুলো বেশিরভাগই মিলে যেত। শব্দের গতির সঙ্গে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেন তিনি। ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কটিও তিনি আবিষ্কার করেন। আল বিরুনি সূক্ষ্ম ও শুদ্ধ গণনার একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন। পন্থার নাম ‘দি ফরমুলা অব হিন্টার পোলেশন’। এ ছাড়া তিনি প্রসিদ্ধ ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক পঞ্জিকাবিদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি ১০৪৮ সালে মৃ’ত্যুবরণ করেন।

Ibn Sina
Ibn Sina

ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ সাল)

ইসলামের শ্রেষ্ঠ চার বিজ্ঞানীর মধ্যে ইবনে সিনা (Ibn Sina) একজন। ল্যাটিন ইউরোপে তিনি ‘অ্যাভিসেনা’ নামে পরিচিত। চিকিৎসাশাস্ত্রে তার অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ১৮ শতকের শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ বছর ধরে তার লিখিত বইগুলো অক্সফোর্ড, কেমব্রিজসহ ইউরোপের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বসহকারে পড়ানো হতো। চতুর্মুখী জ্ঞানের অধিকারী ইবনে সিনা জ্যোতির্বিজ্ঞানেও রেখেছেন অসামান্য অবদান।

বিশুদ্ধতর গণনা করার উপযোগী যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের চিন্তাই ইবনে সিনাকে প্রথমে পেয়ে বসে। এই বিদ্যার প্রতি তার এতই অনুরাগ ছিল যে, শেষ বয়সে তিনি গতিশীল পরিমাপ যন্ত্রের মতো সূক্ষ্ম গণনা করার উপযোগী একটি যন্ত্রও আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে যেন যান্ত্রিক সংযোজন নিখুঁতভাবে হয়ে থাকে। তিনি কয়েকটি জ্যোতিষ্ক-গবেষণাগার স্থাপন ছাড়াও হামাদানে কয়েকটি মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

ইবনে সিনা ভার্নিয়ার স্কেলের মতো একটি স্কেল উদ্ভাবন করেন যা দিয়ে ক্ষুদ্রাক্ষুদ্র অংশ পরিমাপ করা যেত। তিনি গবেষণা করে গেছেন আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে। তিনি ব্যবহার করেছিলেন একটি ‘এয়ার থার্মোমিটার’ বা ‘বায়ু থার্মোমিটার’।

ইরানের একটি প্রদেশ খোরাসানের শাসক ছিলেন ইবনে সিনার বাবা আবদুল্লাহ। ৯৮০ সালে বুখারার নিকটবর্তী আফশানাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১০৩৭ সালে ইসফাহানে মৃত্যুবরণ করেন ইবনে সিনা।


দশম শতকের শেষ দিকে বহু মুসলিম জ্যোতির্বিদ বাগদাদে বাস করতেন। তাঁদের মধ্যে আলী বিন আমজুর, আবুল হাসান আলী, আল খুজান্দি, মাসলামা বিন আহমদ উল্লেখযোগ্য। গাণিতিক ও কবি ওমর খৈয়ামও একজন জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি নিশাপুরে মানমন্দির স্থাপন ও পারস্যপঞ্জিকা সংস্কার সম্মেলনে যোগ দেন।

মঙ্গোলীয় যুগে নাসিরুদ্দীন তুসি প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন।

মুসলিম বিশ্বে জ্যোতির্বিদ হিসেবে আরো অবদান রেখেছিলেন কুতুবুদ্দীন সিরাজি, আল হাসিব, বখি, নাইরিজা, সাহল কুহি, আবদুর রহমান সুফি, ইবনে হাতিম, খাজিনি, ইবনে তোফায়েল, বিতরুজি, উদি মহিউদ্দিন, মাগরিবি, গিয়াসুদ্দিন জামশেদ, উলুঘ বেগ, কাদিজাদা রুমি, ইবনে আমাজুর, আবুল হাসান প্রমুখ বিজ্ঞানী ও মনীষী।

তাঁদের আবিষ্কার, গবেষণাগ্রন্থ ও সূত্রের মাধ্যমে আধুনিক ইউরোপ আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করে।


পড়ার মত আরও আছে

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.