হাদীসের আলোকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ১০টি আমল

HelloBanglaWorld - Know Everything in Banglaইসলামহাদীসের আলোকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ১০টি আমল
Advertisements

আল্লাহ তাআ’লা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদাত করার জন্য। যারা সঠিক উপায়ে তার হুকুম-আহকাম পালন করবে, তাঁদের উপর আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তির জন্য রহমত বর্ষণ করবেন।

আল্লাহর বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত নবীও (সা.) জাহান্নামের আগুন থেকে ভীত ছিলেন এবং নিজেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তায়া’লার কাছে ক্ষমা চাইতেন। তিনি তার উম্মাতদেরকেও এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করেছেন। কিভাবে জাহান্নাম থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে, এ সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে উম্মাহের জন্য আমলের পথ বলে দিয়েছেন। আমি এই লেখায় এই উপায়গুলোকে একত্রিত করে একটি সংকলন করেছি। আল্লাহ তায়া’লা আমাদের সকল বিশুদ্ধ মানসিকতার বান্দাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।

১) অন্যের গীবত থেকে দূরে থাকা

আসমা বিনতে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, “যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্ভ্রম রক্ষা করে, সে আল্লাহর কাছে এ অধিকার পায় যে, তিনি তাকে দোজখ থেকে মুক্ত করে দেন”।(মুসনাদে আহমদ, সহিহুল জামে, হাদিস : ৬২৪০)

২) প্রতিদিন ৩৬০ বার তাসবিহ, তাহলিল, তাকবীর, তাহমিদ আদায় করা

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “আদম সন্তানের মধ্যে প্রত্যেক মানুষকে ৩৬০ গ্রন্থির ওপর সৃষ্টি করা হয়েছে। (আর প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় সদকা রয়েছে।) সুতরাং, যে ব্যক্তি ‘আল্লাহু আকবার’ বলল, ‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, ‘সুবহানাল্লাহ’ বলল, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ বলল, মানুষ চলার পথ থেকে পাথর, কাঁটা অথবা হাড় সরাল, কিংবা ভালো কাজের আদেশ করল, অথবা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করল (এবং সব মিলে ৩৬০ সংখ্যক পুণ্যকর্ম করল), সে ঐ দিন এমন অবস্থায় সন্ধ্যা যাপন করল যে, সে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূর করে নিল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২২০)

৩) ৪০ দিন তাকবীরে উলার সাথে সলাত আদায় করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “কেউ যদি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ‘সুবহানাল্লাহ’ ৩৩ বার, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ৩৩ বার, ‘আল্লাহু আকবার’ ৩৩ বার পাঠ করে, এরপর একবার ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ পাঠ করে, ওই ব্যক্তির সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সাগরের ফেনার সমতুল্য হয়।” (মুসলিম, হাদিস : ১২৩৯)

৪) ‘আয়াতুল কুরসি’ পাঠ করা

যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ‘আয়াতুল কুরসি’ পাঠ করবে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে জান্নাতবাসী হবে। (নাসাঈ : ৫/৩৩৯; সিলসিলাহ সহিহাহ : ৯৭২)

৫) সদকা করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচ, যদিও খেজুরের এক টুকরো সদকাহ করে হয়। আর যে ব্যক্তি এর সামর্থ্য রাখে না, সে যেন ভালো কথা বলে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪১৩)

৬) জান্নাতের জন্য দোয়া করা

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, “কোনো ব্যক্তি যদি জান্নাতের জন্য আল্লাহর কাছে তিনবার প্রার্থনা করে, তাহলে জান্নাত তখন বলে, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর কোনো ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাইলে, জাহান্নাম তখন আল্লাহর কাছে বলে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন।” (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৭২)

৭) জোহরের সুন্নত আদায় করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে জোহরের ফরজ নামাজের আগে চার রাকাত সুন্নত ও জোহরের ফরজের পরে চার রাকাত (২+২) সুন্নাত ও নফল নামাজ আদায় করবে, মহান আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।” (ইবনে মাজাহ : ১১৬০, আবু দাউদ, হাদিস : ১২৬৯)

৮) ফযর ও আসর সালাত আদায় করা

আবু বকর ইবনে শায়বা, আবু কুরায়ব ও ইসহাক ইবনে ইবরাহিম (রহ.)… আবু বকর ইবনে উমর ইবনে রুয়াইবা (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তের আগে অর্থাৎ ফজর ও আসরের সালাত আদায় করে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। তখন বসরার এক ব্যক্তি তাঁকে বলেন, আপনি কি এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তখন ঐ ব্যক্তি বলল, আমি এই মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি নিজ কানে তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছি এবং আমার হৃদয়ে তা গেঁথে রেখেছি।” (মুসলিম, হাদিস : ১৩১১)

৯) আন্তরিকভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে উপস্থিত হবে যে তার ওপর জাহান্নাম হারাম।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৪৬৮২)

১০) জান্নাতি ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম? যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি (জনপ্রিয়), সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী (তার জন্য জাহান্নাম হারাম)।” (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৮)

আল্লাহুম্মা আঝিরনি মিনান নার।
“হে আল্লাহ! আমাদিগকে জাহান্নামের (ভয়াবহ) আজাব থেকে মুক্তি দান করুন”

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর কথা বলার পূর্বে সাত বার এ দোয়াটি পড়া। যদি কেউ ফজরের পর পড়ে এবং ঐ দিনের মধ্যে মারা যায়, ঐ ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। আর কেউ যদি মাগরিবের নামাজের পর এ দোয়াটি পড়ে এবং ঐ রাতে মারা যায় তবে তার জন্য জাহান্নাম হতে মুক্তি লিখে দেওয়া হয়।” (মিশকাত, আবু দাউদ)

সুতরাং, মুসলিম উম্মাহর উচিত, ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর এ দোয়াটি ৭ বার পড়া।

১১) মানুষের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করা

বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, “যে ব্যাক্তি পছন্দ করে যে, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক, তার মৃত্যু যেন আল্লাহ্ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখা অবস্থায় আসে এবং লোকেদের সঙ্গে সেই রকম ব্যাবহার করে, যে রকম ব্যবহার সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

১২) চোখকে পাপ থেকে হিফাযত করা

রাসুল (সা.) বলেন, “কিয়ামতের দিন জাহান্নাম দেখবে না, (১) এমন চক্ষু যে আল্লাহ’র ভয়ে কাঁদে, (২) এমন চক্ষু যে, আল্লাহ’র রাস্তায় জেগে থাকে, (৩) এমন চক্ষু যে, বেগানা মহিলাকে দেখে নিচু হয়ে যায়।”

১৩) কন্যাসন্তানদের ভালভাবে লালন-পালন করা

আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমার নিকট একটি মহিলা তার দুটি কন্যাকে সঙ্গে করে ভিক্ষা করতে (গৃহে) প্রবেশ করল। কিন্তু সে আমার নিকট খেজুর ছাড়া আর কিছু পেল না। আমি খেজুরটি তাকে দিলাম সে সেটিকে দুই খণ্ডে ভাগ করে তার দুটি মেয়েকে খেতে দিল। আর নিজে তা হতে কিছুও খেলনা। অতঃপর সে উঠে বের হয়ে গেল। তারপর নবী (সা.) আমাদের কাছে এলে আমি ঐ কথা তাঁকে জানালাম। ঘটনা শুনে তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি একাধিক কন্যা নিয়ে সঙ্কটাপন্ন হবে, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথার্থ সদ্ব্যবহার করবে, সেই ব্যক্তির জন্য ঐ কন্যারা জাহান্নাম থেকে অন্তরাল (পর্দা) স্বরূপ হবে।” (সহিহুল বুখারী- ১৪১৮)

১৪) ফরয সিয়ামের পাশাপাশি বেশি-বেশি নফল সিয়াম পালন করা

রাসুল (সা.) বলেন “রোযা (জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য ) ঢালস্বরূপ।” (বুখারী- ১৮৯৪)
রাসুল (সাঃ) আরও বলেছেন “যে ব্যাক্তি আল্লাহর পথে ১ দিন রোযা রাখবে, আল্লাহ্ ঐ ১ দিন রোযার বিনিময়ে তার চেহারাকে জাহান্নাম হতে ৭০ বছর (পরিমাণ পথ) দূরে রাখবেন।”
(বুখারী- ২৮৪০)

১৫) সন্তান বা আপনজনদের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ করা

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা.) বলেন এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! কেবলমাত্র পুরুষেরাই আপনার হাদীস শোনার সৌভাগ্য লাভ করছে। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যও একটি দিন নির্ধারিত করুন। আমরা সে দিন আপনার নিকট আসব, আপনি আমাদের তা শিক্ষা দেবেন, যা আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন।’

তিনি বললেন, “তোমরা অমুক অমুক দিন একত্রিত হও।” অতঃপর নবী (সাঃ) তাদের নিকট এসে সে শিক্ষা দিলেন, যা আল্লাহ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে কোন মহিলার তিনটি সন্তান মারা যাবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে আড় হয়ে যাবে।” এক মহিলা বলল, ‘আর দু’টি সন্তান মারা গেলে?’ তিনি বললেন, “দু’টি মারা গেলেও (তাই হবে)।” (বুখারী, নং ১০১)


নিশ্চয় মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হবে এই জান্নামের আগুনের শাস্তি। দুনিয়াতে মানুষের উপরে বিপদ নেমে আসলে যেভাবে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে মরিয়া হয়ে উঠে, তদ্রুপ একই তাড়নার দিয়ে জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ তায়া’লা যথা সময়ে এই শুভ বুদ্ধি পাওয়ার তৌফিক দান করুন এবং সবাইকে এই আমলগুলো করার মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন।

ক্যাটাগরিঃ ইসলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.